যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা যখন আবারও আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কেন্দ্রে, তখন পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ইসলামাবাদে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে পাকিস্তান নিজেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সম্ভাব্য সংলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এই ভূমিকা ঐতিহ্যগত অর্থে কোনো নিরপেক্ষ মধ্যস্থতা নয়। বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসলামাবাদের পরিবর্তিত সম্পর্ক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাস্তবতা এবং ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের জটিল সম্পর্কের ফল।
মূল প্রশ্ন হলো—এই কূটনৈতিক উদ্যোগ কি পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করবে, নাকি দুই দেশের পুরোনো সন্দেহ ও প্রতিযোগিতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলবে?
পাকিস্তানের মধ্যস্থতার পেছনে কী রয়েছে?
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরব এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব, বিশেষ করে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
এই পরিবর্তিত সম্পর্কই পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকটে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় নিয়ে এসেছে।
তবে পাকিস্তানের এই অবস্থান ওমানের মতো ঐতিহ্যবাহী মধ্যস্থতাকারী দেশের সঙ্গে তুলনীয় নয়। ওমান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগের একটি নির্ভরযোগ্য চ্যানেল হিসেবে পরিচিত। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এই ভূমিকার ভিত্তি মূলত নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ।
তেহরানের দৃষ্টিতে পাকিস্তান
ইরানের কাছে পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দুই দেশের মধ্যে রয়েছে ৯০০ কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত, যেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই স্পর্শকাতর।
তবে সম্পর্কের ভেতরে রয়েছে গভীর অবিশ্বাস।
ইরানের অভিযোগ, পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী ইরানের বিরুদ্ধে কার্যক্রম পরিচালনা করে। অন্যদিকে পাকিস্তানেরও অভিযোগ রয়েছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা সমস্যা মোকাবিলায় ইরানের সহযোগিতা যথেষ্ট নয়।
ফলে পাকিস্তানকে তেহরান একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রতিবেশী এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে দেখে।
মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের লাভ কোথায়?
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রধান লক্ষ্য ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ানো।
ইসলামাবাদ দেখাতে চায় যে, আঞ্চলিক সংকট সমাধানে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই ভূমিকা কার্যকর করতে হলে পাকিস্তানকে ইরানের আস্থাও অর্জন করতে হবে। কারণ কোনো পক্ষের ওপর প্রভাব না থাকলে মধ্যস্থতার কার্যকারিতা সীমিত হয়ে যায়।
এই কারণেই পাকিস্তান একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে অন্যদিকে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রাখছে।
আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা
পাকিস্তানের বর্তমান কৌশল বোঝার ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।
একসময় তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতির সময় ইসলামাবাদ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে।
কিন্তু ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তান-আফগান সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যায়।
এই অভিজ্ঞতা দেখায়, কোনো পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বা মধ্যস্থতার ভূমিকা সবসময় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সুবিধা নিশ্চিত করে না।
ইরানের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য হতে পারে।
ইরান-পাকিস্তান সম্পর্কের দ্বৈত চরিত্র
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকে ইরান ও পাকিস্তানের সম্পর্ক এক ধরনের ভারসাম্যের রাজনীতির মধ্য দিয়ে এগিয়েছে।
শাহ আমলে দুই দেশের সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় ইরান পাকিস্তানের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
কিন্তু বিপ্লবের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়, আর পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠে।
এরপর আফগানিস্তান, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে।
সম্পর্কের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
ইরান-পাকিস্তান সম্পর্কের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সীমান্ত নিরাপত্তা।
দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি বহু বছর ধরে উত্তেজনার কারণ হয়ে আছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দুই দেশ একে অপরের ভূখণ্ডে হামলা চালানোর ঘটনা প্রমাণ করে, প্রকাশ্য বন্ধুত্বপূর্ণ বক্তব্যের আড়ালে নিরাপত্তা উদ্বেগ কতটা গভীর।
এই সম্পর্কের মূল বৈশিষ্ট্য হলো—কূটনৈতিক ভাষায় বন্ধুত্ব, কিন্তু বাস্তবে সতর্ক দূরত্ব।
নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতা
বর্তমানে পাকিস্তান সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও নতুন ধরনের সম্পর্ক তৈরি করছে।
অন্যদিকে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপ মোকাবিলা করে আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখতে চাইছে।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কোনো একটি পক্ষের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত না হয়ে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখা।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে দেশটি কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে দুই পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে পারে তার ওপর।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন