× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

এ এইচ এম ফারুক

প্রকাশিত: জুলাই ১৬, ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম

জুলাই গণ-অভ্যুত্থাণ: ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আগামীর সতর্কবার্তা

এ এইচ এম ফারুক

প্রকাশিত: জুলাই ১৬, ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম

ছবি: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এ এইচ এম ফারুক।

ছবি: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এ এইচ এম ফারুক।

ইতিহাসের কিছু বাঁক বদল ঘটে তরুণদের বুকের তাজা রক্তে, যা নিমিষেই একটি সাধারণ আন্দোলনকে রূপান্তরিত করে স্বৈরাচার পতনের অবিনাশী মহাকাব্যে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনই এক অভূতপূর্ব ও রক্তস্নাত অধ্যায়। এই লড়াইয়ের মনস্তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক শিকড় মূলত প্রোথিত ছিল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনায়। ১৯৭১ সালে আমাদের পূর্বসূরিরা বুক পেতে দিয়েছিলেন পাকিস্তানি শোষক আর স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে, বাঙালির প্রকৃত স্বাধীনতার জন্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, স্বাধীনতার সেই মূল চেতনা ও মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার যখন ২০০৯ সালের পর থেকে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার বিশেষ করে ২০১৩ সালের পর থেকে পরিকল্পিতভাবে হরণ করতে শুরু করে, তখনই ১৯৭১-এর বীরত্বগাথা বুকে ধারণ করা বাঙালির এই প্রজন্ম আবার ফুঁসে ওঠে। 

স্বৈরাচারী শাসনের দীর্ঘ দমবন্ধ পরিবেশের বিরুদ্ধে জমতে থাকা ক্ষোভের সেই সুদীর্ঘ বহিঃপ্রকাশ ও চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। কেউ একে বলছেন ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ’, কেউ বলছেন ‘ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান’। তবে সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব অংশগ্রহণে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে এই ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অবশেষে কলঙ্কময় ফ্যাসিবাদমুক্ত এক নতুন দিগন্তে পদার্পণ করে। 

২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নেমেছিল, তখন রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের দাবির মানবিক দিকটিকে বিবেচনা না করে অহংকার, দমন-পীড়ন এবং চরম উপহাসের পথ বেছে নিয়েছিল। ক্ষমতা ও দম্ভের অন্ধ মোহে থাকা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের এক প্রকার কটাক্ষ করে তাদের মর্যাদাহানি করেছিলেন। এই অপমান ও বঞ্চনার বোধই তরুণ প্রজন্মকে মনে করিয়ে দিয়েছিল ১৯৭১-এর সেই শোষকদের রূপ, যা তাদের ঘরে ফেরার পথ বন্ধ করে দেয়। এরপর রাষ্ট্র ও তার অনুগত পেটুয়া বাহিনী যখন নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে চড়াও হতে শুরু করল, তখনই দৃশ্যপটে আসেন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক আবু সাঈদ। শহীদ হবার মাত্র একদিন আগে, ১৫ জুলাই এক সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের জন্য লড়ে যাওয়ার যে অকুতোভয় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন, ১৬ জুলাই দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দিয়ে পুলিশের বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি সেই কথারই সত্যতা প্রমাণ করে যান। একই দিনে চট্টগ্রামের রাজপথে বীরদর্পে লড়াই করতে করতে শাহাদাত বরণ করেন আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ ছাত্রদলনেতা ওয়াসিম আকরাম। এই আধুনিক যুগে, অধিকার আদায়ের আন্দোলনে এভাবে বুক পেতে দেওয়াটা কল্পনারও অতীত ছিল, কিন্তু আবু সাঈদ ও ওয়াসিম দেশের সার্বভৌমত্ব ও মুক্তির জন্য তা-ই করে দেখালেন। 

আন্দোলনের প্রথম দিকে এই দুই বীরের রক্তে ভেজা রাজপথ দেশের কোটি মানুষের বিবেককে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয়। আবু সাঈদের বুক পেতে দেওয়ার সেই দৃশ্য যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন স্তব্ধ শিক্ষার্থীরা আর ঘরের কোণে বসে থাকতে পারেনি। তাঁরা কেবল সাধারণ আন্দোলনকারী ছিলেন না, তারা ছিলেন সামনের সারির নেতা। গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়েই তাঁরা রাজপথে নেমেছিলেন এবং সেই লড়াইয়ের শেষ প্রান্তে নিজেদের শাহাদাতের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। আবু সাঈদ ও ওয়াসিমের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে জন্ম নিল এক নতুন চেতনা, যা শুধু কোটা সংস্কারের গণ্ডি পেরিয়ে এক দফা অর্থাৎ স্বৈরাচারী সরকারের পতনের দাবিতে রূপ নিল। পুরো বাংলাদেশ রূপ নিল এক বিক্ষুব্ধ মহাসমুদ্রে। দল, মত, ধর্ম ও শ্রেণি নির্বিশেষে ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক, রিকশাচালক, দিনমজুর এবং সাধারণ জনতা দলে দলে ঢাকার রাজপথের দিকে ধাবিত হতে লাগলেন।  

এরপর বাংলাদেশসহ গোটা পৃথিবী দেখেছে, শুধু ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখার জন্য নিজ দেশের নিরস্ত্র ও নির্দোষ নাগরিকদের ওপর একটি স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট সরকার কতটা বর্বরোচিত ও জঘন্যতম নিপীড়ন চালাতে পারে। ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করে, কারফিউ জারি করে এবং বুক লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে প্রায় দুই সহস্র তাজা প্রাণ কেড়ে নেওয়া হলো। কিন্তু রক্তচক্ষু ও মারণাস্ত্র দিয়ে যে জনস্রোতকে আর রোখা যায় না, তা অহংকারী শাসকেরা কখনোই বুঝতে পারে না। ৫ আগস্ট যখন ছাত্র-জনতার সেই উত্তাল ও অপরাজেয় মহাসমুদ্র গণভবনের দিকে ধাবিত হলো, তখন ক্ষমতার সেই বিশাল দুর্গ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। অন্যায় ও জুলুম কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আবু সাঈদ ও ওয়াসিমের রক্ত ও প্রাণ উৎসর্গের ঠিক ২০ দিনের মাথায় প্রবল জনরোষের মুখে দলবল ও দেশের মানুষকে চরম বিপদে ফেলে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হলেন তৎকালীন জালিম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই পলায়ন বিশ্ব ইতিহাসে স্বৈরাচারীদের করুণ ও লজ্জাজনক পরিণতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হয়ে থাকবে। 

জুলাই-আগস্টের এই রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনার লজ্জাজনক পতন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সব সরকারের জন্যই এক চিরস্থায়ী এবং অমোঘ সতর্কবার্তা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো শাসক বা দল যখন নিজেকে জনগণের চেয়ে বড় মনে করতে শুরু করে, যখন সে ভাবে যে বন্দুকের নল দিয়ে ক্ষমতাকে অনন্তকাল টিকিয়ে রাখা সম্ভব, তখনই তার পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। জনরোষ এমন এক দাবানল, যা কোনো বুলেটের দেওয়াল দিয়ে নেভানো যায় না। বর্তমান ও আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালকদের মনে রাখতে হবে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার একমাত্র উৎস জনগণ। জনগণের ন্যূনতম মৌলিক অধিকার, আত্মমর্যাদা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে যদি কোনো সরকার তাদের অবদমিত করতে চায়, তবে তার কপালেও শেখ হাসিনার মতোই চরম পরিণতি এবং লজ্জাজনক পলায়নের ইতিহাস লিখে রাখা থাকবে। কোনো সরকারই যেন কখনো জনগণের পালসের বিরুদ্ধে গিয়ে দেশ চালানোর দুঃসাহস না দেখায়। সবচেয়ে বড় কথা, এই দেশে যেন আর কোনো ‘নব্য ফ্যাসিস্ট’ বা নতুন স্বৈরাচারের জন্ম না হতে পারে, সে বিষয়ে দেশের পুরো নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক শক্তিকে সবসময় সচেতন ও সচেষ্ট থাকতে হবে।

তবে স্বৈরাচার পতনের পর বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের হাওয়া সচেতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিশেষ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান যেভাবে ক্ষমতার প্রথাগত ও অহংকারী খোলস ছেড়ে একেবারে জনতার কাতারে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন, সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যাচ্ছেন, তা সর্বমহলে ভীষণভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। তিনি প্রটোকল ও ক্ষমতার জাঁকজমক একপাশে সরিয়ে রেখে সরাসরি তৃণমূলের মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপন করছেন, যা দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ বাংলাদেশে এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয়। একজন রাষ্ট্রনায়ক বা প্রধানমন্ত্রীর এমন বিনয়ী ও জনমুখী আচরণ নিঃসন্দেহে আগামীর বাংলাদেশের জন্য এক বড় আশার আলো। 

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই ইতিবাচক ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ তখনই সফল হবে, যখন তার সরকারের অন্যান্য মন্ত্রী, সংসদ সদস্য (এমপি) এবং মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতারাও এই একই আদর্শে দীক্ষিত হবেন। ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে অনেকেই প্রায়ই ভুলে যান যে তারা জনগণের শাসক নন, বরং সেবক। প্রধানমন্ত্রীর জনমুখী আচরণকে ধূলিসাৎ করতে এই সরকারের ভেতরের কিছু অতি-উৎসাহী মন্ত্রী-এমপি বা তৃণমূলের কিছু সুযোগসন্ধানী নেতাই যথেষ্ট, যদি তারা নিজেদের শুধরে না নেন। তাই এই সরকারের সব পর্যায়ের নেতাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান থাকবে আপনারা ক্ষমতার মোহে অন্ধ না হয়ে সাধারণ মানুষের পালস ও চাওয়া-পাওয়াকে বোঝার চেষ্টা করুন। বিগত সরকারের মতো নতুন করে কোনো জুলুম, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, হয়রানি কিংবা প্রতিপক্ষকে নির্যাতনের পুরোনো খেলায় মেতে উঠবেন না। ক্ষমতার ছায়াতলে এসে যদি কেউ আবারও পূর্ববর্তী স্বৈরাচারের রূপ ধারণ করে, তবে তা জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের সাথে চরম বেঈমানি হবে।

শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ ওয়াসিমসহ জুলাই বিপ্লবের প্রায় দুই সহস্র শাহাদাতবরণকারী বীরেরা আমাদের ওপর এক অনন্ত ও অপরিশোধ্য ঋণ রেখে গেছেন। তারা নিজেদের জীবন দিয়ে আমাদের এই পবিত্র জমিনকে ফ্যাসিবাদের মুক্ত বাতাস উপহার দিয়েছেন, যার চেতনা মূলত ৭১-এর অসমাপ্ত লড়াইয়েরই এক আধুনিক রূপ। তাদের এই মহিমান্বিত আত্মত্যাগ আমাদের ইতিহাসের পাতায় এক অবিচ্ছেদ্য ও স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে। এই রক্তের মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্ব এখন রাষ্ট্র ও সরকারের। 
ক্ষমতার দম্ভ পরিহার করে, নব্য স্বৈরাচার গড়ে ওঠার সব পথ বন্ধ করে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনসেবার মাধ্যমেই কেবল এই শহীদদের আত্মার শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব। মহান রব্বুল আলামীন জুলাই বিপ্লবের সব শহীদদের কবুল করুন এবং তাঁদের সবাইকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।

লেখক: এ এইচ এম ফারুক (A H M Faruk)
সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ইমেইল: [email protected]

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!