রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অভিযোগ করেছেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার দায়িত্ব পালনকালে বারবার সাংবিধানিক বিধান অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। গত শুক্রবার রাতে বঙ্গভবনে ‘কালের কণ্ঠ’কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘দেশের শান্তিশৃঙ্খলা চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার অনেক পাঁয়তারা হয়েছে।’
‘তখন যত অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, সেগুলো হয়তো তৎকালীন সময়ের প্রয়োজনীয়তার জন্যই হয়েছে। তার পরও আমার দৃষ্টিতে মনে হয়েছে, অনেক অধ্যাদেশ করার কোনো কারণ ছিল না। প্রধান উপদেষ্টা সংবিধানের কোনো বিধান মেনে চলেননি, বলেন রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংবিধানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘সংবিধানে বলা আছে, উনি যখনই বিদেশ সফরে যাবেন, সেখান থেকে ফিরে এসে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করবেন এবং আমাকে ওই আউটপুটটা জানাবেন।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘উনি (ড. ইউনূস) তো বোধহয় ১৪ থেকে ১৫ বার বিদেশ সফরে গেছেন। একবারও আমাকে জানান নাই। একবারও আমার কাছে আসেননি।’
সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি সেই সংকটময় সময়ে সশস্ত্র বাহিনীর জোরালো ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি জানান, সেই সময়ে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা পেয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘তারা শুধু একটা কথাই বলেছে, ‘মহামান্য, আপনি হচ্ছেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। আপনার পরাজিত হওয়া মানে পুরো সশস্ত্র বাহিনীরই পরাজিত হওয়া। এটা আমরা যেকোনো মূল্যে রোধ করব।’ শেষ পর্যন্ত তারা এটা করেছে। তারা বিভিন্ন সময় আমার কাছে এসে আমাকে মনোবল দিয়েছে।’
রাষ্ট্রপতি আরও দাবি করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকেই তাকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি চেষ্টা চালানো হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতেও তিন বাহিনীর প্রধানগণ তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানকে সরাসরি জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তারা কোনো ধরনের অসাংবিধানিক কর্মকা- হতে দেবেন না। বঙ্গভবনের সামনে যখন মব সৃষ্টি করা হয়, তখনো সশস্ত্র বাহিনী ওই অবস্থান নিয়েছিল বলে তিনি জানান।
দুঃসময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ওই কঠিন সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন। তারা তখনো সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণœ রাখার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন।’
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে নিজের ব্যক্তিগত ধারণার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতূহল জমা ছিল। কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।’
২০২৪ সালের ২২ অক্টোবরের বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের স্মৃতিচারণ করে রাষ্ট্রপতি একে ‘ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘ওই রাতটা আমার জন্য ছিল বিভীষিকাময়। এই যে ফ্লাইওভার, এই ফ্লাইওভার দিয়ে ওই পেছনে, ওদিকে খালি ঠেলাগাড়ি, ভ্যান, কাভার্ডভ্যান দিয়ে চারদিকে ছিন্নমূল লোকজন আসে। গণভবনের মতো বঙ্গভবনও লুট করতে চেয়েছিল। আমরা তো ঘরেই ছিলাম। আমাদের তো আর কিছু নেই, এখান থেকে তো আমি পালাব না, তাই না? সেই অবস্থা যদি হতো, তখন একটা কথা ছিল। তিন স্তরের নিরাপত্তা দিয়ে কভার করা হয়েছে। সেনাবাহিনী খুব দৃঢ়তার সঙ্গে, আবার এপিসি দিয়ে ঠেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।’
তিনি আরও জানান, ওই রাতে তৎকালীন উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম তাকে ফোন করে বলেন, ‘এ রকম একটা খবর পাওয়া গেছে, ওরা আমাদের লোক না। আমি এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেছি। এগুলো সব আমরা ডিসপার্স করার চেষ্টা করছি।’
পদত্যাগের চাপের মুখেও নতি স্বীকার করেননি উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমাকে কতভাবে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে! কোনো পরিস্থিতিতেই আমি ভেঙে পড়িনি। আমি বলেছি, আমার রক্ত ঝরে যাবে বঙ্গভবনে। রক্ত ঝরে ঝরুক। আরেক ইতিহাসে আমি যোগ হব। কিন্তু আমি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করবÑ আমি এই সিদ্ধান্তেই অবিচল ছিলাম। আল্লাহর ইচ্ছা আর আমার দৃঢ়তা।’
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতির পুরো প্রেস উইং প্রত্যাহার করা হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রেস সেক্রেটারি, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রেস সেক্রেটারিÑ তিনজনকেই নিয়ে গেল। পুরো উইংটাই প্রত্যাহার করে নিয়ে গেল। এমনকি দুজন ফটোগ্রাফার ছিল, যারা ৩০ বছর এখানে কাজ করছিল ফটোগ্রাফার হিসেবে, তাদেরও প্রত্যাহার করে নিয়ে গেল। প্রেস উইং একদম নিল করে দিল। আমরা এখান থেকে কোনো প্রেস রিলিজ দিতে পারি না। বাংলাদেশের ক্রিকেট টিম কোথাও জিতলে অভিনন্দন জানিয়ে যে একটা প্রেস রিলিজ দেব, সেটাও পারি না। একদম প্রতিবন্ধী করে দিল। আমি রাষ্ট্রপতি হয়ে নিজে ক্যাবিনেট সেক্রেটারিকে বারবার ফোন করেছি, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারিকে ফোন করেছি, এস্টাবলিশমেন্ট সেক্রেটারিকে ফোন করেছি। কেউই পাত্তা দেয়নি।’
সাক্ষাৎকারের শেষে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘মূলত ওই সরকার চায়নি কোথাও আমার নাম আসুক। আমাকে একদম অন্ধকারে ফেলে রাখার চেষ্টা করেছে। তারা চায়নি জনগণ আমাকে চিনুক, জানুক। এটি আমাকে খুবই কষ্ট দিয়েছে। শুধু বিদেশে নয়, দেশের কোনো অনুষ্ঠানেও আমাকে যেতে দেয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এসব করা হয়েছে বাংলাদেশের জনগণের কাছে আমার এক্সপোজারটা বন্ধ করার জন্য। এই যে দেশের বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলোতে রাষ্ট্রীয় ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়, সেখানে রাষ্ট্রপতির ছবি ও বাণী দেওয়া বন্ধ করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ক্রোড়পত্র ঠিকই প্রকাশিত হয়। তাতে আমার বাণী দেয় না। আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখেন, গত দেড় বছরে আমার কোনো বাণী গেছে কি না।’
এ সময় তিনি বলেন, ‘দেড় বছর বঙ্গভবনের অভিজ্ঞতা যে ভালো, তা বলা যাবে না। আমার ওপর দিয়ে যে ঝড় গেছে, এ রকম ঝড় সহ্য করার মতো ক্ষমতা অন্য কারো ছিল কি না আমি জানি না।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন