ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

স্বাস্থ্য খাতে শুভঙ্করের ফাঁকি

হাসান মাহমুদ
প্রকাশিত: মে ২৩, ২০২৬, ১২:২৭ এএম

দেশের স্বাস্থ্য খাতে একদিকে যেমন বাড়ছে বরাদ্দের দাবি, অন্যদিকে আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা ও দীর্ঘসূত্রতায় বরাদ্দের বড় অংশই অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভয়াবহ জনবলসংকট। ফলে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ আর চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।

জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আর্ক ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য বাজেট ও জনবলসংক্রান্ত প্রতিবেদনে এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, স্বাস্থ্য খাতের সংকট মূলত কাঠামোগত দুর্বলতা, পরিকল্পনার অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ব্যবস্থাপনার অদক্ষতার ফল।

মূল বাজেট কমে যায় সংশোধিত বাজেটে : প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি অর্থবছরেই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মূল বাজেট সংশোধিত বাজেটে এসে বড় আকারে কমে যাচ্ছে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের জন্য প্রথমে বরাদ্দ ছিল ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা, যা জাতীয় বাজেটের ৫ দশমিক ২০ শতাংশ। পরে সংশোধিত বাজেটে তা কমে দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৯২৫ কোটি টাকায়, অর্থাৎ প্রায় ১৩ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা কমানো হয়। জাতীয় বাজেটে এর অংশও নেমে আসে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশে। একইভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও মূল বরাদ্দ ৩৮ হাজার ৫২ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ২৯ হাজার ৭৮২ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় বাজেট ঘোষণা করলেও তা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা স্বাস্থ্য খাতের দুর্বল ব্যবস্থাপনাকেই প্রকাশ করে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, টেন্ডার জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতায় বরাদ্দের বড় অংশ খরচ করা সম্ভব হয় না।

স্বাস্থ্য খাতে ভয়াবহ জনবলসংকট : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মোট ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭০টি পদের মধ্যে বর্তমানে ৪৮ হাজার ৫২টি পদ খালি, যা মোট পদের প্রায় ৩৪ শতাংশ। বিশেষ করে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের পদে শূন্যতার হার ৫২ শতাংশ। ফলে হাসপাতালগুলোতে পরিচ্ছন্নতা ও রোগীসেবায় মারাত্মক সংকট তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকসহ প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদেরও ১৯ শতাংশ পদ খালি রয়েছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ৫৪ হাজার ১৯৫টি পদের মধ্যে ১৬ হাজার ৯২১টি শূন্য। মাঠ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ দশম গ্রেডের প্রায় ৮০ শতাংশ পদ খালি থাকায় মা ও শিশুস্বাস্থ্য কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

চিকিৎসা শিক্ষা অধিদপ্তরেও ৩৪ শতাংশ পদ খালি। এর মধ্যে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকের ৭২ শতাংশ পদ শূন্য থাকায় চিকিৎসা শিক্ষার মান কমছে। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরেরও প্রায় ৯ শতাংশ পদ খালি রয়েছে।

বাড়ছে জনগণের ভোগান্তি : জনবলসংকট ও বাজেট অব্যবস্থাপনার কারণে সরকারি হাসপাতালে রোগীরা প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে রিএজেন্ট সংকট বা যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকার কারণে রোগীদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে প্রশাসনিক ও টেন্ডার প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন জরুরি। একই সঙ্গে জনগণের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সরকারি হাসপাতালে বিনা মূল্যে ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক সেবা বাড়াতে হবে। তার মতে, স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান শূন্যতাগুলো দূর করতে একটি যুগোপযোগী ও স্বাধীন ‘স্বাস্থ্য সেবা কমিশন’ গঠন করা যেতে পারে, যা এই খাতের কাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

আর্ক ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রোমানা হক বলেন, স্বাস্থ্য খাত বর্তমানে এক ধরনের ‘পক্ষাঘাতগ্রস্ত’ অবস্থায় রয়েছে। বরাদ্দের অব্যবহার, শয্যাসংকট, যন্ত্রপাতি বিকল থাকা এবং বিপুল শূন্যপদ পুরো ব্যবস্থাকে দুর্বল করে ফেলেছে। তার মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের অবশ্যই আমূল সংস্কারে হাত দিতে হবে। বর্তমানের ট্যাক্সভিত্তিক দুর্বল কাঠামো থেকে বের হয়ে এসে সর্বজনীন স্বাস্থ্য বীমা চালু করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে কোন অঞ্চলে কী পরিমাণ মানুষ কী ধরনের রোগে ভুগছেনÑ সেই বাস্তব বা চাহিদাভিত্তিক সম্পদ বণ্টন এবং তা বাস্তবায়নে একটি শক্তিশালী ও আপসহীন রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

উত্তরণের উপায় : বিদ্যমান নাজুক পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে হলে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি বলে মনে করেন আর্ক ফাউন্ডেশনের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এই সংকট উত্তরণে তাদের পক্ষ থেকে প্রধানত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রথমত, বর্তমানের প্রচলিত করভিত্তিক (ট্যাক্স-ভিত্তিক) স্বাস্থ্যব্যবস্থা থেকে বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে বিশ্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা ‘হেলথ ইন্স্যুরেন্স’ (স্বাস্থ্য বীমা) ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য বাজেটের ক্ষেত্রে সমতা বা ইকুইটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাজেটকে অবশ্যই লিঙ্গ-সংবেদনশীল হতে হবে, যেখানে নারী ও প্রসূতি মায়েদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ থাকবে। একই সঙ্গে দেশের ক্রমবর্ধমান শিশু এবং বয়োবৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা বাজেটে রাখা দরকার। বিশেষ করে শহর ও গ্রামের স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে যে বিশাল বৈষম্য রয়েছে, তা দ্রুত দূর করতে হবে। প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের ধরে রাখতে বিশেষ ভাতা ও আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিয়েছেন তারা। সর্বশেষ, স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান শূন্যপদগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিশেষ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পূরণ করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে স্বাস্থ্য ক্যাডার এবং নন-ক্যাডার পদের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও স্বচ্ছ করা এখন সময়ের দাবি।