ঢাকা রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬

তিন মিনিটে গবেষণাপত্র উপস্থাপন

তরুণ উদ্ভাবকদের মিলনমেলায় উৎসবমুখর চুয়েট

ফাইয়াজ কৌশিক, চুয়েট
প্রকাশিত: জুলাই ১৯, ২০২৬, ০৩:০৬ এএম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভুল তথ্যের সমাধান, স্মার্ট ইনসুলিন প্যাচ, প্রবাসী কর্মীদের জন্য ব্লকচেইন-ভিত্তিক নিরাপদ নিয়োগব্যবস্থা কিংবা বন্যাকালে ড্রোনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ত্রাণ বিতরণÑ এমন নানা উদ্ভাবনী গবেষণার ধারণা নিয়ে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) হাজির হয়েছিলেন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ গবেষকেরা। তবে এসব গবেষণার মূল ভাবনা উপস্থাপনের জন্য তাদের হাতে ছিল মাত্র তিন মিনিট। গতকাল শনিবার চুয়েটের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ‘সাইব্লিটজ ২.০’-এর অন্যতম আকর্ষণ ‘থ্রি মিনিট থিসিস (৩এমটি)’ প্রতিযোগিতা। আন্তর্জাতিক ৩এমটি ফরম্যাট অনুসরণে প্রতিযোগিতাটির আয়োজন করে আইইইই চুয়েট স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চ।

দেশের মোট ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪৭টি দল এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই জটিল গবেষণাকে সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের দক্ষতার ভিত্তিতে প্রতিযোগীদের মূল্যায়ন করেন বিচারকেরা।

গবেষণা উপস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর একটি অভিনব ধারণা তুলে ধরেন একদল প্রতিযোগী। তাদের গবেষণায় দেখানো হয়, ভুল বা অস্পষ্ট নির্দেশনার কারণে এআই অনেক সময় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্য বা ‘হ্যালুসিনেশন’ তৈরি করে। প্রায় ২৮ হাজার পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখান, আরও উন্নত এআই তৈরির চেয়ে কার্যকর প্রম্পট বা নির্দেশনা ব্যবহারের মাধ্যমে এ সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। কম্পিউটার আর্কিটেকচারভিত্তিক আরেকটি গবেষণায় মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে প্রসেসরের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা বাড়ানোর একটি পদ্ধতি উপস্থাপন করা হয়। পারসেপট্রন-ভিত্তিক এ প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রসেসরের ভুল ব্রাঞ্চ অনুমান কমিয়ে কর্মক্ষমতা ও গতি বাড়ানোর সম্ভাবনা তুলে ধরেন গবেষকেরা।

স্বাস্থ্যসেবা খাতে প্রযুক্তির প্রয়োগ নিয়ে উপস্থাপিত একটি গবেষণায় ছিল ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য স্মার্ট ইনসুলিন প্যাচ। মাইক্রোনিডল প্রযুক্তিনির্ভর এই প্যাচ স্মার্টফোনের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনসুলিন সরবরাহ করতে পারে। গবেষকদের মতে, এ প্রযুক্তি রোগীদের বারবার ইনজেকশন নেওয়ার প্রয়োজন কমিয়ে চিকিৎসা আরও সহজ ও আরামদায়ক করতে পারে। এ ধরনের উপাদান ভবিষ্যতে নির্মাণ, পরিবহন ও ইলেকট্রনিকস শিল্পে পণ্যের স্থায়িত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি অপচয় ও ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে।

প্রবাসী কর্মীদের নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে ব্লকচেইন-ভিত্তিক ‘সেইফপাস’ নামের একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও উপস্থাপন করা হয়। এতে নিরাপদ ডিজিটাল পরিচয়, স্মার্ট কন্ট্রাক্ট, রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ এবং যাচাইকৃত নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দালালনির্ভরতা ও প্রতারণা রোধে একটি কাঠামো তুলে ধরা হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে উপস্থাপিত আরেকটি গবেষণায় বন্যাকালে ড্রোনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ত্রাণ বিতরণব্যবস্থার ধারণা তুলে ধরা হয়। ক্লাউডভিত্তিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মাধ্যমে ড্রোন নির্ধারিত স্থান থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করে জিপিএসের সহায়তায় দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে দিতে পারে। গবেষকদের দাবি, এ ব্যবস্থা প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় দ্রুত, অধিক কার্যকর এবং পরিবেশবান্ধব।

গবেষণাকে সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের দক্ষতা গড়ে তুলতে ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডে ‘থ্রি মিনিট থিসিস (৩এমটি)’ প্রতিযোগিতার সূচনা হয়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে জনপ্রিয় এ প্রতিযোগিতায় মাত্র তিন মিনিটে একটি স্থির স্লাইডের মাধ্যমে গবেষণার মূল ধারণা, পদ্ধতি ও সম্ভাব্য প্রভাব উপস্থাপন করতে হয়।

এতে নবায়নযোগ্য জ¦ালানি, টেলিযোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, স্মার্ট অবকাঠামো, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা নিয়ে বক্তব্য দেন আমরার্ক লিমিটেডের চেয়ারম্যান জিসু পার্ক, প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাফায়াত আজিজ চৌধুরী, রবি আজিয়াটা পিএলসির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার আব্দুস সবুর শান্ত, ট্রমা ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ডা. রিভু রাজ চক্রবর্তী, সিমেন্স বাংলাদেশের ম্যানেজার মিঠু কুমার ভৌমিক, ই-সফটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল হাসান অপু এবং লাইটক্যাসল পার্টনার্সের প্রিন্সিপাল বিজনেস কনসালট্যান্ট ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার ওমর ফারহান খান।

চুয়েট আইইইই স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের সভাপতি ইনজামাম উল হক সিয়াম বলেন, গত বছর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো তিন মিনিট থিসিস কম্পিটিশন জাতীয় পর্যায়ে আয়োজনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয় সাইব্লিজের। মোট ৯টি টিমকে প্রাইজমানি দেওয়ার মাধ্যমে যারা গবেষণা করে, তাদের জন্য ফান্ডিংয়ের খুবই সুবর্ণ সুযোগ করে দিচ্ছি। আয়োজিত এই তিন মিনিট থিসিস কম্পিটিশন শুধু চতুর্থ বর্ষের রিসার্চারদের জন্য নয়, বরং গবেষণার আইডিয়া আছে এমন সবার জন্যই আয়োজন করা। তাই গবেষণায় আগ্রহী সবার জন্যই পারফেক্ট গ্রাউন্ড তৈরি করে দিচ্ছে।