ভিসা জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকৃত পাসপোর্টধারী নারীর বদলে অন্য এক নারীকে ইতালিতে পাঠানোর অভিযোগে সংঘবদ্ধ একটি চক্রের ৭ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডি জানিয়েছে, চক্রটি ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশগামী ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিত। পাশাপাশি জালিয়াতির মাধ্যমে মানবপাচারের সঙ্গেও তারা জড়িত ছিল।
সিআইডি জানায়, এক নারীর পাসপোর্ট ও ভিসা ব্যবহার করে অন্যজনকে ইতালি পাঠানোর অভিযোগ তদন্ত করতে নেমে চক্রটির সন্ধান মেলে। অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কার্যালয় থেকে ৩টি সিপিইউ, একটি এইচপি ল্যাপটপ, বিভিন্ন ব্যক্তির নামে থাকা ৫৬টি পাসপোর্ট, সরকারি-বেসরকারি ও বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যবহৃত ১৫৩টি সিল, একটি লোহার তৈরি এম্বোস সিল এবং নগদ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আবু তালেব স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত রোববার রাজধানীর গুলশান-১ এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রটির ৭ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় গুলশান থানায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬ এবং দ-বিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেনÑ লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার জয়পুরা এলাকার মো. বেলায়েত হোসেন (৪০), দিশুয়া এলাকার নাজমুল হাসান (১৯), জয়পুরা এলাকার মেহেদী হাসান (৩৭), রতনপুর এলাকার মো. সোলাইমান সুমন (৩২), জয়পুরা এলাকার ফজলে রাব্বী (২৭), মাদারীপুরের কালকিনী উপজেলার আন্ডারচর এলাকার মো. তৌহিদুর রহমান (২৪) এবং ঢাকার মিরপুরের কাওসার হোসেন (৪২)।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ভুক্তভোগী নারী দীর্ঘদিন ধরে স্বামী ও চার সন্তানকে নিয়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এ জন্য তিনি ইতালি দূতাবাসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পাসপোর্ট জমা দেন। ইতিমধ্যে পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে নবায়নের জন্য দূতাবাসে গেলে সেখানে নাজমুল হাসানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। নাজমুল নিজেকে পাসপোর্ট নবায়ন ও ইতালির ভিসা করিয়ে দেওয়ার কাজে সক্ষম ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি ওই নারীকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাসপোর্ট নবায়ন করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে গুলশান-১ এলাকার একটি ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যান। সেখানে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান হিসেবে বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে ওই নারীর পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। অভিযুক্তরা তাকে ইতালির ভিসা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আর্থিক চুক্তি করে। চুক্তিতে ভিসা হলে টাকা পরিশোধের কথা বলা হয়। পরে ১৫ এপ্রিল ওই নারীর মোবাইলে একটি বার্তা আসে। বিষয়টি নাজমুলকে জানালে তিনি তাকে ইতালির দূতাবাসে যেতে বলেন। পরদিন ১৬ এপ্রিল দূতাবাস থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বের হওয়ার পর নাজমুলসহ কয়েকজন ব্যক্তি তার কাছে চুক্তির টাকা দাবি করেন। তাৎক্ষণিকভাবে টাকা দিতে না পারায় তারা জোর করে তার পাসপোর্ট নিয়ে নেয় বলে অভিযোগ করেন ওই নারী। পরে পাসপোর্ট ফেরত ও ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আশায় তিনি অভিযুক্তদের দেওয়া ব্যাংক হিসাবে ১৯ এপ্রিল ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ১১ মে ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা দেন। পরে তাকে পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয়। এরপর ভুক্তভোগীর ইতালিপ্রবাসী স্বামী স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য বাংলাদেশ বিমানের টিকিট বুক করেন। নির্ধারিত দিনে ওই নারী সন্তানদের নিয়ে বিমানবন্দরে গেলে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা জানান, তার পাসপোর্টে থাকা ইতালির ভিসা ব্যবহার করে অন্য এক অজ্ঞাত নারী ২৪ এপ্রিল ইতালিতে চলে গেছেন। এ তথ্য জানার পর ওই নারী বুঝতে পারেন, তার পাসপোর্ট ও ভিসা ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে অন্য একজনকে ইতালি পাঠানো হয়েছে। পরে তিনি সিআইডির মানবপাচার শাখায় অভিযোগ করেন।
সিআইডি জানায়, অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত ও গোয়েন্দা কার্যক্রম শুরু করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা ও অভিযুক্তদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা বিদেশে যেতে আগ্রহী ব্যক্তিদের টার্গেট করে ইতালির ভিসা ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখাত। পরে বিভিন্ন কৌশলে তাদের কাছ থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করে নিজেদের কাছে রাখত এবং জালিয়াতির মাধ্যমে ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকৃত পাসপোর্টধারীর বদলে অন্য ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠাত। সিআইডি বলছে, জব্দ করা ৫৬টি পাসপোর্ট ও ১৫৩টি সিলের উপস্থিতি থেকে ধারণা করা হচ্ছে, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে ভিসা জালিয়াতি ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত।
তদন্তে আরও জানা গেছে, চক্রের মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত বেলায়েত হোসেন দীর্ঘদিন ধরে একই পদ্ধতিতে বিদেশে লোক পাঠানোর সঙ্গে জড়িত। ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিনি একই কৌশলে প্রায় ৩০ জনকে ইতালিতে পাঠানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। বেলায়েত হোসেন একই ধরনের অপরাধের অভিযোগে ২০২৪ সালে বিমানবন্দর থানায় করা একটি মামলায় জামিনে রয়েছেন। মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন।
বর্তমানে মামলার তদন্ত করছে সিআইডির মানবপাচার শাখা। সিআইডি বিদেশে কর্মসংস্থান, অভিবাসন বা ভ্রমণের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ বা পাসপোর্ট হস্তান্তর না করার জন্য নাগরিকদের সতর্ক করেছে। একই সঙ্গে সরকার অনুমোদিত বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং ভিসার নামে অস্বাভাবিক অর্থ দাবি, পাসপোর্ট জিম্মি করে রাখা বা জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সিআইডিকে জানানোর আহ্বান জানিয়েছে।

