বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিঃসন্দেহে এক ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে এ নির্বাচন শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ, নাগরিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের এক ঐতিহাসিক সুযোগ। রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত যে নির্বাচনি আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে, তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, দেশবাসী এই ভোটকে নিছক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখছে না, বরং ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক বড় উপলক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে।
এবারের নির্বাচনের বিশেষত্ব বহুস্তরীয়। একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় ভোটারদের সামনে এসেছে দ্বৈত দায়িত্ব। একদিকে প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ, অন্যদিকে রাষ্ট্রের কাঠামোগত ও নীতিগত অঙ্গীকারে সরাসরি মত দেওয়ার অধিকার। এতদিন ভোট মানেই ছিল একটি ব্যালট, একটি সিল এবং দীর্ঘ অপেক্ষা কিন্তু এবার সেই ভোট হয়ে উঠছে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের প্রতীক। সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে, এই ভোট শুধু পাঁচ বছরের জন্য সংসদ সদস্য বেছে নেওয়া নয়, বরং রাষ্ট্র কোন পথে চলবে, সেই সিদ্ধান্তেও তাদের কণ্ঠ যুক্ত হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এবারের নির্বাচন ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত রাজনৈতিক শক্তির পাশাপাশি ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক দলের উত্থান রাজনীতিতে নতুন ভাষা ও নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, বিকল্প চিন্তার উপস্থিতি এবং নতুন প্রতীকের আবির্ভাব প্রমাণ করে, বাংলাদেশের রাজনীতি আর একমুখী নয়। বিশেষ করে নারী ভোটারদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ এই নির্বাচনি আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। ঘরের আঙিনা থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত নারীরাও নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগে প্রস্তুত। যা সামাজিক অগ্রগতির একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।
গ্রামগঞ্জের চায়ের দোকান, হাটবাজার, খেলার মাঠ কিংবা শহরের ব্যস্ত মোড়, সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রে নির্বাচন। কে কেমন প্রার্থী, এই ভোটে দেশ কোন দিকে যাবে, এসব নিয়েই চলছে প্রাণবন্ত বিতর্ক। এ আলোচনাই প্রমাণ করে, ভোট নিয়ে মানুষের আগ্রহ এখন আর কৃত্রিম নয়। বরং তা এসেছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও নীরবতার পর নিজের কথা বলার সুযোগ ফিরে পাওয়ার আনন্দ থেকে।
তবে এ উৎসবমুখর পরিবেশের মাঝেও কিছু বাস্তব উদ্বেগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনা ও গুপ্ত হামলার আশঙ্কা নির্বাচনি পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। অতীত ইতিহাস বলে, নির্বাচন এলেই কিছু অশুভ শক্তি অস্থিতিশীলতা তৈরির জন্য মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। নির্বাচন বানচালের জন্য নাশকতার চেষ্টা করে। তাই এ মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশন যে প্রস্তুতির কথা বলছে, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে দেশবাসী। ভয়মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে নির্বাচনি উৎসবের রং ম্লান হয়ে যেতে পারে।
এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, মতপার্থক্য থাকবে এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন সহিংসতা, ঘৃণা কিংবা উসকানিতে রূপ না নেয়। জনগণ এখন আর ফাঁকা বুলি চায় না, তারা চায় বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি, স্বচ্ছ রাজনীতি এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এ প্রত্যাশাকে সম্মান করা।
মোটা দাগে বলতে গেলে, বাংলাদেশ আজ ঠিক এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যেখানে এ নির্বাচন হতে পারে অতীতের বিভাজন, অনাস্থা ও ভয়কে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথচিহ্ন। যদি এ ভোট অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়, তবে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তারা বিশ^াস করতে শুরু করবে গণতন্ত্র শেষ পর্যন্ত জনগণের হাতেই ফিরে আসে।
আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, নির্বাচনি উৎসব ছড়িয়ে পড়ুক সারাদেশে। এবারের নির্বাচন ভয় নয়, হোক ভরসা। সহিংসতা নয়, হোক মতের লড়াই। অন্ধ আনুগত্য নয়, হোক সচেতন সিদ্ধান্ত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সত্যিকার অর্থেই হয়ে উঠুক জনগণের ভোট, জনগণের উৎসব এবং বাংলাদেশের নতুন যাত্রার সূচনা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন