বৈশ্বিক শিক্ষা সংস্কার, ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পাঠদান নিয়ে যখন উৎসবমুখর আলোচনা চলছে, তখন একটি নিষ্ঠুর নীরবতা চেপে বসে থাকেÑ সেই লক্ষ শিশুর নীরবতা, যারা দারিদ্র্যের নির্মম নিষ্পেষণে বই-খাতা ফেলে চিরতরে স্কুলের আঙিনা থেকে বিদায় নেয়। একেই বলে ‘নীরবে ঝরে পড়া’। নি¤œআয়ের দেশগুলোতে প্রতি পাঁচজন শিশুর একজন প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে না। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়Ñ এটি একটি ব্যর্থতার দলিল, একটি স্বপ্নের মৃত্যু।
এই ট্র্যাজেডি কেবল ব্যক্তিগত নয়। এটি জাতীয় মানবসম্পদের অপচয়, অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার পায়ে বাঁধা সবচেয়ে ভারী শিকল।
১৯৯০ সালে বৈশ্বিক প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ, যা ২০২০-এর দশকে ৯১ শতাংশ ছাড়িয়েছেÑ পরিসংখ্যানে এটি অগ্রগতির চিত্র। কিন্তু ভর্তি হওয়া আর শিক্ষা সমাপ্ত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। ইউনেস্কোর ২০২৫ সালের বৈশ্বিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে ২৭২ মিলিয়ন শিশু ও কিশোর বিদ্যালয়ের বাইরে, যা আগের অনুমানের তুলনায় ২১ মিলিয়ন বেশি। এর মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় বয়সি (৬-১১ বছর) শিশু রয়েছে ৭৮ মিলিয়ন। নি¤œ ও নি¤œ-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রতি পাঁচজন শিশুর একজন প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার আগেই ঝরে পড়ে। সাব-সাহারান আফ্রিকায় এ পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ; সেখানে প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশের চিত্র বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার প্রায় ৯৮ শতাংশ; এটি একটি প্রশংসনীয় অর্জন। অথচ সমাপনী হার এখনো ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশের মধ্যে আটকে আছে। অর্থাৎ প্রতি বছর প্রায় ১৫-২০ শতাংশ শিশু পঞ্চম শ্রেণির সনদ অর্জনের আগেই স্কুলের আঙিনা ছেড়ে বিদায় নেয়। ভর্তি ও সমাপনীর এই ব্যবধানটিই প্রমাণ করে যে শুধু স্কুলে ভর্তি করানোই যথেষ্ট নয়Ñ শিশুকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ।
দারিদ্র্যের বহুমাত্রিক ফাঁদ
দারিদ্র্য কেবল অর্থের অভাব নয়; এটি একটি জটিল ও আন্তঃসম্পর্কিত প্রতিবন্ধকতার জাল, যার প্রতিটি সুতো শিশুকে শিক্ষা থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়। দারিদ্র্য কিভাবে শিশুদের স্কুলছুট করে, তা বোঝার জন্য এর বহুমাত্রিক প্রভাব বিশ্লেষণ জরুরি।
শিশুশ্রম ও সুযোগ ব্যয় : আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ওখঙ) ও ইউনিসেফের ২০২৪ সালের তথ্য অনুসারে, বিশ্বে প্রায় ১৩৮ মিলিয়ন শিশু শ্রমে নিয়োজিত, যার মধ্যে ৫৪ মিলিয়ন বিপজ্জনক কাজে নিযুক্ত। দরিদ্র পরিবারের কাছে একটি শিশু শুধু সন্তান নয়, সম্ভাব্য আয়ের উৎস। স্কুলের পরিবর্তে সে কৃষি, কারখানা বা গৃহকাজে যোগ দেয়। স্কুলে যাওয়া মানে একদিনের রোজগার হারানোÑ এই তাৎক্ষণিক লাভ-ক্ষতির হিসাবে শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি অনেক ক্ষেত্রে হেরে যায়।
শিক্ষার প্রচ্ছন্ন ব্যয় : সরকারিভাবে প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক হলেও খাতা, কলম, স্কুল পোশাক, যাতায়াত এবং প্রাইভেট টিউশনের খরচ মিলিয়ে শিক্ষা দরিদ্র পরিবারের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, নি¤œআয়ের পরিবারের মোট আয়ের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত এই পরোক্ষ শিক্ষাব্যয়ে চলে যায়। এসব ‘লুক্কায়িত ব্যয়’ অনেক পরিবারকে সন্তানদের বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য করে।
ক্ষুধা ও অপুষ্টি : ইউনিসেফের গবেষণা বলছে, অপুষ্ট শিশুদের অনুপস্থিতি বেশি, মনোযোগ ও শেখার ক্ষমতা দুর্বল এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যের মতো মৌলিক চাহিদার অভাব শিক্ষাকে পেছনে ফেলে। বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিলের মতো কর্মসূচি এই সমস্যার আংশিক সমাধান হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা এখনো অপ্রতুল।
লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য : দারিদ্র্যের আঘাত কন্যাশিশুদের ওপর দ্বিগুণভাবে পড়ে। নি¤œআয়ের পরিবারগুলোতে পুত্রসন্তানের শিক্ষায় অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও মেয়েশিশুকে গৃহস্থালি কাজ বা বাল্যবিয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী স্কুলের বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা এখনো অনেক বেশি। দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকায় এই প্রবণতা স্পষ্ট। অনিরাপদ যাতায়াত ও পর্যাপ্ত স্যানিটেশনের অভাবও কন্যাশিশুদের ঝরে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
শিক্ষার নি¤œমান : অপর্যাপ্ত শিক্ষক, দুর্বল অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ ও আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রমের অভাবেও শিশুরা স্কুল থেকে আগ্রহ হারায়। ইউনেস্কোর ২০২৩ সালের গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট জানাচ্ছে, নি¤œআয়ের দেশগুলোতে প্রায় ৭০ শতাংশ দশ বছর বয়সি শিশু একটি সহজ গল্প পড়ে বুঝতে পারে নাÑ এটিকে বলা হয় ‘শিক্ষণ দারিদ্র্য’ বা খবধৎহরহম চড়াবৎঃু। যখন অভিভাবকরা দেখেন যে বছরের পর বছর স্কুলে গিয়েও শিশু কোনো কাজের দক্ষতা অর্জন করছে না, তখন তারা যুক্তিসংগতভাবেই শিশুকে স্কুল থেকে তুলে নেন।
বাংলাদেশের স্থানীয় বাস্তবতা
বাংলাদেশে ব্যানবেইস ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, বিদ্যালয় ত্যাগের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অভিভাবকের আর্থিক অসচ্ছলতা (প্রায় ৪০% ক্ষেত্রে), ছেলেদের আয়-উপার্জনের চাপ এবং মেয়েদের গৃহস্থালির কাজে নিয়োগ। উপকূলীয় ও হাওর-বেষ্টিত এলাকায় মৌসুমি অভিবাসন শিশুদের শিক্ষায় বারবার ছেদ ফেলে, যা একসময় স্থায়ী ঝরে পড়ায় রূপ নেয়। পোশাকশিল্প ও কৃষিতে শিশুশ্রম এবং নদীভাঙন এলাকার বিশেষ ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্য। উপবৃত্তি কর্মসূচি পরিস্থিতির উন্নতিতে সহায়তা করেছে; তবে গ্রামীণ, চরাঞ্চল ও প্রান্তিক সম্প্রদায়ে এখনো বড় ফাঁক রয়ে গেছে।
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার ১৯৯০ সালে ছিল মাত্র ৩৪ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ৯০ শতাংশে। কিন্তু ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চমাধ্যমিক স্তরে প্রবেশকারীদের মধ্যে ঝরে পড়ার হার ২০০৯ সালের ৪২ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ২১ শতাংশে নেমে এলেও, প্রত্যন্ত ও দরিদ্র অঞ্চলে প্রাথমিক স্তর শেষ না করেই ঝরে পড়ার হার রয়ে গেছে উল্লেখযোগ্য। দারিদ্র্য, মৌসুমি অভিবাসন ও শিশুশ্রম (বিশেষত কৃষি ও পোশাকশিল্পে) এখানে অন্যতম বাধা।
স্কুল থেকে ঝরে পড়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
শিশুদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার অর্থনৈতিক ক্ষতি বিশাল। ইউনেস্কোর ‘দ্য প্রাইস অব ইন্যাকশন’ বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে মৌলিক দক্ষতাহীন ও ঝরে পড়া শিশুদের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি বছরে হারাবে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ফ্রান্স ও জাপানের জিডিপির চেয়েও বেশি। ঝরে পড়া মাত্র ১০% কমালেই বার্ষিক জিডিপি বাড়বে ১-২%। বিশ্বব্যাংকের হিসাব, শিক্ষার অতিরিক্ত এক বছর আয় বাড়ায় ৯-১০%। অথচ ঝরে পড়া শিশুরা আটকে যায় নি¤œআয়, দুর্বল স্বাস্থ্য আর দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রেÑ যা পরবর্তী প্রজন্মেও বয়ে যায়।
জাতীয়ভাবে এর ফল : ধীর জিডিপি বৃদ্ধি, থেমে যাওয়া উদ্ভাবন আর ভঙ্গুর সামাজিক স্থিতি।
সংকট উত্তরণে করণীয়
সমাধানের জন্য দরকার সমন্বিত বহুমুখী পদক্ষেপ। শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা ও উপবৃত্তি বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ে পুষ্টিকর মধ্যাহ্নভোজ (স্কুল ফিডিং) কর্মসূচি, লিঙ্গসংবেদনশীল অবকাঠামো, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, জীবনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক পাঠ্যক্রম ও আনন্দের সঙ্গে শিক্ষাÑ এই পদক্ষেপগুলো একত্রে কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষত, দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য শর্তসাপেক্ষ উপবৃত্তি ও নগদ সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে, যেন শিক্ষার প্রচ্ছন্ন ব্যয় মেটানো সম্ভব হয়। ক্ষুধামুক্ত শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী ‘মিড-ডে মিল’ অত্যন্ত কার্যকর, যা শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে জাদুর মতো কাজ করে। পাশাপাশি শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা অপরিহার্য। শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ে রোধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিউনিটি মনিটরিং জোরদার করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে শিশুবান্ধব ও কর্মমুখী করা গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি অর্থায়নে শিক্ষা নিশ্চিত করা; আনুষঙ্গিক শিক্ষা ব্যয় হ্রাস করা এবং নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলাÑ বিশেষত মেয়েশিশুদের জন্য আলাদা স্যানিটেশন ও নিরাপদ যাতায়াতব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে নীরবে ঝরে পড়া কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়Ñ এটি বৈষম্য ও দারিদ্র্যের প্রতিচ্ছবি। এটি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানায়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য শুধু ভর্তি নিশ্চিত করলেই চলবে না; প্রতিটি শিশুকে বিদ্যালয়ে ধরে রেখে প্রাথমিক শিক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করার সুযোগ দিতে হবে। কারণ একটি শিশুর ঝরে পড়া মানে শুধু একটি ফাঁকা বেঞ্চ নয়Ñ একটি সম্ভাবনার মৃত্যু, একটি জাতির ভবিষ্যতের ক্ষয়। এই নীরবতা ভাঙতে এখনই দরকার সমন্বিত, জোরালো পদক্ষেপ।

