রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ দমন করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশের দায়িত্ব অপরিসীম। জনগণ যখন কোনো বিপদে পড়ে, যখন কোনো অপরাধের শিকার হয় কিংবা যখন ন্যায়বিচারের আশায় দ্বারস্থ হয়, তখন প্রথম যে প্রতিষ্ঠানের কথা মনে আসে তা হলো পুলিশ। এ কারণেই পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনো পুলিশ সদস্য বা কর্মকর্তার দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য কিংবা অনাকাক্সিক্ষত আচরণ সেই আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলতে পারে।
সম্প্রতি নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানার ওসি মো. আবুল হাশেমের একটি অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাল হওয়া ওই অডিওতে তাকে পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বিভিন্ন মন্তব্য করতে শোনা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। বিশেষ করে ‘পুলিশের চাকরি এক ধরনের ব্যবসা’ বলে প্রচারিত বক্তব্যটি জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। অডিওটির সত্যতা ও পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট অবশ্যই তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। তবে এমন বক্তব্য জনসম্মুখে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছেÑ এ ধরনের মন্তব্য কি একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীর ভাবমূর্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
পুলিশ কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠান নয়। এটি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনকারী বাহিনী। একজন পুলিশ সদস্যের পোশাকের সঙ্গে রাষ্ট্রের মর্যাদা, জনগণের নিরাপত্তা এবং আইনের শাসনের প্রতীক জড়িয়ে থাকে। ফলে এই বাহিনীর সদস্যদের প্রতিটি কথা, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি আচরণ সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। একজন কর্মকর্তা যদি এমন কোনো মন্তব্য করেন যা জনমনে পুলিশের নিরপেক্ষতা বা সততা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করে, তাহলে তার প্রভাব ব্যক্তির সীমা ছাড়িয়ে পুরো বাহিনীর ওপর পড়ে।
বাংলাদেশ পুলিশে অসংখ্য কর্মকর্তা ও সদস্য রয়েছেন যারা দিন-রাত পরিশ্রম করে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন। অনেকেই সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, মাদকবিরোধী কর্মকা-, দুর্যোগ মোকাবিলা কিংবা অপরাধ দমনে অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক পুলিশ সদস্য জীবনও উৎসর্গ করেছেন। তাদের অবদান দেশের মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। কিন্তু কিছু বিতর্কিত ঘটনা বা অসতর্ক মন্তব্যের কারণে সেই ইতিবাচক অর্জনগুলো অনেক সময় ম্লান হয়ে যায়। সাধারণ মানুষের চোখে পুরো বাহিনী প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে কোনো বক্তব্য গোপন থাকে না। একটি অডিও, ভিডিও বা লিখিত বক্তব্য মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হয়। বিশেষ করে পুলিশের মতো একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীর কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ তাদের বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে বিবেচিত হয় না; বরং তা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান সম্পর্কেও মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি করে।
এ ধরনের ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরপেক্ষ তদন্ত। কোনো অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেই সেটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে অডিও সম্পাদনা, বিকৃতি বা বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনার ঘটনাও ঘটতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলোÑ বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা, অডিওর সত্যতা যাচাই করা এবং প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা। তদন্তে যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
অনেকে মনে করেন, একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে বিষয়টি ব্যক্তিগত শাস্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তবে বিষয়টি তার চেয়েও বড়। কারণ জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হলে অন্যরাও সতর্ক হয়। এতে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা সুসংহত হয় এবং ভবিষ্যতে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার পুনরাবৃত্তি কমে আসে। কোনো প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার অন্যতম উপায় হলো অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এতে জনগণও বুঝতে পারে যে প্রতিষ্ঠানটি নিজের ভেতরের ভুল-ত্রুটি সংশোধনে আন্তরিক।
রাষ্ট্রের কোনো বাহিনীই বিতর্কিত কর্মকা- বা দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণকে প্রশ্রয় দিতে পারে না। কারণ একটি বাহিনীর শক্তির মূল উৎস হলো জনগণের আস্থা। অস্ত্র, ক্ষমতা কিংবা প্রশাসনিক কর্তৃত্বের চেয়েও বড় বিষয় হলো মানুষের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস নষ্ট হলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকারিতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় হয়।
বর্তমান সময়ে জনগণ আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে উচ্চমানের পেশাদারিত্ব প্রত্যাশা করে। তাই পুলিশের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীর সদস্যদেরও সততা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ এবং পেশাগত নৈতিকতার সর্বোচ্চ মান বজায় রাখতে হবে। জনগণের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং বাহিনীর মর্যাদা অক্ষুণœ রাখা প্রতিটি সদস্যের দায়িত্ব।
সবশেষে বলা যায়, নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানার ওসিকে ঘিরে আলোচিত অডিওর বিষয়টি শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিতর্ক নয়; এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। যদি অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। কারণ শাস্তির ভয় নয়, বরং জবাবদিহির সংস্কৃতিই একটি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে। পুলিশ বাহিনীর মর্যাদা, জনগণের আস্থা এবং আইনের শাসন অটুট রাখতে দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য বা আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়াই আজ সময়ের দাবি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন