ঢাকা শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

সম্পাদকীয়

চট্টগ্রাম বন্দরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হোক

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২৬, ১১:৫০ পিএম

চট্টগ্রাম বন্দর কেবল একটি বন্দরই নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবেশদ্বার, বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র এবং শিল্পোন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। দেশের প্রায় সমগ্র আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের সিংহভাগ এই বন্দরকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। শিল্প-কারখানার কাঁচামাল, ভোগ্যপণ্য, জ¦ালানি, খাদ্যশস্য কিংবা রপ্তানিমুখী পণ্যÑ সবকিছুর সরবরাহ ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল এই বন্দরের কার্যকারিতা ও দক্ষতার ওপর। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো সিদ্ধান্তকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। এখানে গৃহীত প্রতিটি সিদ্ধান্ত জাতীয় অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ, শিল্পোন্নয়ন এবং ব্যবসায়িক আস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বার্থ অপারেটর ও শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগকে ঘিরে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। অভিযোগ উঠেছে, নতুন প্রতিযোগীদের বাজারে প্রবেশের পথ রুদ্ধ করে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য ধরে রাখার জন্য একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। যদিও অভিযোগের সত্যতা নিরূপণ আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিষয়, তবে ঘটনাপ্রবাহ যেভাবে এগিয়েছে, তাতে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

প্রথমে নতুন লাইসেন্সিং নীতিমালা প্রণয়ন এবং পরবর্তীতে লাইসেন্সের জন্য আবেদন আহ্বান নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছিল। অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে আবেদনও করে। এতে ধারণা তৈরি হয়েছিল যে বন্দরের কার্গো হ্যান্ডলিং ব্যবস্থায় নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হবে। কিন্তু আবেদন গ্রহণের পরপরই লাইসেন্স প্রদান কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, যেদিন লাইসেন্স প্রদান স্থগিত করা হলো, সেদিনই দীর্ঘমেয়াদি বার্থ অপারেটর নিয়োগের টেন্ডার আহ্বান করা হয়।

বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকদের সমান সুযোগের নিশ্চয়তা দিয়েছে। ব্যবসা পরিচালনা, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও এই নীতি প্রযোজ্য। তাই আবেদনকারীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ফি ও প্রয়োজনীয় নথি গ্রহণের পর কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়া প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা এবং একই সঙ্গে টেন্ডার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া ন্যায়সংগত কি না, তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এ কারণেই বিষয়টি আদালতের নজরে এসেছে এবং হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। আদালত জানতে চেয়েছেন, লাইসেন্স প্রদান স্থগিতের সিদ্ধান্ত কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং পাঁচ বছরের জন্য বার্থ অপারেটর নিয়োগের টেন্ডার কেন বাতিল করা হবে না। এটি প্রমাণ করে যে, বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন নয়; বরং এর সঙ্গে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক সুশাসনের প্রশ্নও জড়িত।

চট্টগ্রাম বন্দর কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্রের সম্পদ, জনগণের সম্পদ। এর প্রতিটি কার্যক্রম পরিচালিত হতে হবে উন্মুক্ততা, জবাবদিহি এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে। লাইসেন্সিং ও টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য সমাধান প্রয়োজন। প্রয়োজনে পুরো প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়ন করে এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে যোগ্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সমানভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।

আমরা মনে করি, চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ কোনো গোষ্ঠীগত স্বার্থের ওপর নির্ভর করতে পারে না। এটি নির্ভর করবে কতটা স্বচ্ছভাবে, কতটা ন্যায়সঙ্গতভাবে এবং কতটা প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বন্দর পরিচালিত হচ্ছে তার ওপর। প্রতিযোগিতার পথ রুদ্ধ করে সাময়িকভাবে কারো স্বার্থ রক্ষা করা গেলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হবে। তাই এখনই সময়, সব ধরনের সন্দেহ ও বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি স্বচ্ছ, উন্মুক্ত এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করার।