× UCB Sticker Card
শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আমানুর রহমান, শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ

প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২৬, ১২:০৮ এএম

মানসিক মহামারিতে মানুষের মন

আমানুর রহমান, শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ

প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২৬, ১২:০৮ এএম

মানসিক মহামারিতে মানুষের মন

ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিশ্ব অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করলেও, এক অদৃশ্য মহামারির থাবায় বিশ্ববাসী আজ চরম সংকটে। এ সংকট ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের নয়, বরং এটি মানুষের মনের গভীরে বাসা বাঁধা এক নীরব ঘাতকÑ মানসিক অসুস্থতা। একসময় মানুষ করোনাভাইরাস বা ইবোলার মতো রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত থাকলেও, বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার চিত্র উঠে এসেছে। জানা যায়, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছেন, যা ১৯৯০ সালের তুলনায় বিস্ময়করভাবে ৯৫ শতাংশ বেশি। গত তিন দশকে শারীরিক নানা রোগের বিরুদ্ধে মানুষ জয়ী হলেও মানসিক স্বাস্থ্যের লড়াইয়ে আমরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছি। চাকচিক্যময় জীবনের আড়ালে মানুষের ভেতরের জগৎ কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে, এই পরিসংখ্যান তারই প্রমাণ। তাই মানসিক সমস্যাকে আর কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই; এটি এখন গোটা মানবসভ্যতার জন্য এক ভয়ংকর বৈশ্বিক সংকট হিসেবে আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ছে।

আধুনিক বিশ্বের যান্ত্রিকতায় পিষ্ট মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র হতাশা ও উদ্বেগ। পরিসংখ্যানের পাতায় এটি যে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে, তা আমাদের সমাজব্যবস্থার অন্তর্নিহিত ত্রুটিগুলোকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ল্যানসেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে মানুষের মধ্যে অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার বা উদ্বেগজনিত সমস্যা সবচেয়ে বেশিÑ প্রায় ১৫৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার বা গুরুতর বিষণœতার হার বেড়েছে ১৩১ শতাংশ। এই বিশাল মনস্তাত্ত্বিক উল্লম্ফনের পেছনে মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে আধুনিক কর্মক্ষেত্রের তীব্র প্রতিযোগিতা, ক্রমবর্ধমান আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে সফল প্রমাণের এক অসুস্থ সামাজিক চাপ।

মানসিক বৈকল্যের এই ভয়াল থাবা সমাজের সর্বস্তরে সমানভাবে আঘাত হানলেও, বয়স ও লিঙ্গভেদে এর বিস্তারের ধরনে সুস্পষ্ট ও অত্যন্ত উদ্বেগজনক ভিন্নতা বৈশ্বিক গবেষণায় প্রমাণিত। প্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যমতেÑ বিষণœতা, বাইপোলার ডিসঅর্ডার, অ্যানোরেক্সিয়া এবং বুলিমিয়ার মতো জটিল মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাগুলোতে পুরুষের তুলনায় নারীরা অনেক বেশি হারে আক্রান্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে এডিএইচডি বা অটিজমের মতো স্নায়বিক বিকাশের সমস্যাগুলো ছেলেদের মধ্যে তুলনামূলক প্রকট। এর পাশাপাশি বর্তমানে সবচেয়ে ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সি কিশোর-কিশোরী ও তরুণ সমাজ; কারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগিক গঠন এই বয়সেই সবচেয়ে সংবেদনশীল থাকে। নারীদের ওপর আরোপিত কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধ এবং বহুমুখী পারিবারিক দায়িত্বের অদৃশ্য চাপ তাদের এই গভীর মনস্তাত্ত্বিক ঝুঁঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আর তরুণরা প্রতিনিয়ত শিকার হচ্ছে বয়ঃসন্ধিকালের প্রাকৃতিক টানাপোড়েন ও আধুনিক ডিজিটাল জীবনের কৃত্রিম প্রত্যাশার। এই বয়সের ছেলেমেয়েরা বাস্তব জগতের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় তাদের আত্মপরিচয়ের সংকট ক্রমশ ঘনীভূত হয়ে উঠছে। অতএব, নির্দিষ্ট বয়স ও লিঙ্গের মানুষের এই ভিন্নধর্মী মনস্তাত্ত্বিক চাহিদাকে অবহেলা করার চলমান সামাজিক সংস্কৃতি অবিলম্বে পরিহার না করলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক পঙ্গু মানসিকতার শিকার হবে।

প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ ও বিস্তার আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে যতটা সহজ ও বিলাসবহুল করেছে, তার চেয়েও বহুগুণ বেশি নির্মমভাবে কেড়ে নিয়েছে মানসিক প্রশান্তি, পারস্পরিক বন্ধন এবং সামাজিক নির্ভরতা। কিশোর-কিশোরী দিনে তিন ঘণ্টার বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে, তাদের বিষণœতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। শহুরে জীবনের একাকিত্ব, কায়িক শ্রমের চরম অভাব, নিয়মিত প্রক্রিয়াজাত অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং অপর্যাপ্ত ঘুমের মতো ক্ষতিকর বিষয়গুলো আধুনিক জীবনযাপনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলো সরাসরি আমাদের মস্তিষ্কের আনন্দদায়ক হরমোনের স্বাভাবিক নিঃসরণকে বাধাগ্রস্ত করে। আমরা ডিজিটালি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও শারীরিকভাবে চরম বিচ্ছিন্নতায় ভুগছি, যা মানুষের মতো সমাজবদ্ধ প্রাণীর জন্য সম্পূর্ণ ও চরম মাত্রায় অস্বাভাবিক।

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং উন্নত জীবনযাপন মানুষকে সর্বোচ্চ সুখী করবে বলে যে প্রচলিত পুঁজিবাদী ধারণা আমাদের সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে, আধুনিক বৈশ্বিক পরিসংখ্যান তাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রমাণ করেছে। ল্যানসেটের বিস্তর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্বের উন্নত ও ধনী দেশগুলোতেই মানসিক রোগীর হার সবচেয়ে বেশি। উদাহরণস্বরূপ, নেদারল্যান্ডসের মতো উন্নত দেশে প্রতি লাখে ৩ হাজার ৫৫৫ জন মানুষ মানসিক রোগে ভুগছেন, যেখানে ভিয়েতনামের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই সংখ্যা মাত্র ১ হাজার ৩০২ জন। এই চরম বৈপরীত্যের মূল কারণ হলো, উন্নত দেশগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, পারিবারিক বন্ধনের অভাব এবং তীব্র একাকিত্ব মানুষকে সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এর পাশাপাশি বর্তমান বিশ্বে যুক্ত হয়েছে ওষুধ কোম্পানিগুলোর অত্যন্ত আগ্রাসী ও অমানবিক বাণিজ্যনীতি। ইউরোপ ও আমেরিকায় সাধারণ মন খারাপ বা স্বাভাবিক আবেগকেও এখন ক্লিনিক্যাল রোগ হিসেবে চিহ্নিত করে ‘ওভার-ডায়াগনোসিস’-এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা অবসাদরোধী ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে।

মানসিক এই ভয়াবহ বৈশ্বিক বিপর্যয় থেকে চূড়ান্ত পরিত্রাণের উপায় কেবল বিলাসবহুল হাসপাতালের প্রেসক্রিপশনে বা দামি ওষুধের বোতলে লুকিয়ে নেই, বরং এর শিকড় নিহিত রয়েছে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনাচরণের মৌলিক ও প্রাকৃতিক পরিবর্তনে। শীর্ষস্থানীয় গবেষক ও চিকিৎসকরা জোরালোভাবে বলছেন যে, স্ক্রিন ব্যবহারের সময় কমিয়ে আনা, নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করা এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের মতো সাধারণ অভ্যাসগুলো যেকোনো রাসায়নিক ওষুধের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে গুণগত সময় কাটানো এবং সবুজে ঘেরা প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রাকৃতিকভাবেই ক্ষতিকর স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা কমে যায় এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি পায়। জীবনের প্রতিটি সাধারণ কষ্ট, দুঃখ বা দুশ্চিন্তাকে অতিরিক্ত চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে অবদমিত করার চেষ্টা না করে, বরং তাকে জীবনের একটি অতি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি। একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে ব্যক্তিপর্যায়ে গভীর আত্মোপলব্ধি এবং একে অপরের প্রতি পারস্পরিক সহমর্মিতার চর্চা বৃদ্ধি করা এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিশেষে নির্দ্বিধায় বলা যায়, কৃত্রিম যান্ত্রিকতার বিষাক্ত বেড়াজাল ছিন্ন করে মানুষ যদি পুনরায় উদার প্রকৃতি ও পারস্পরিক মমত্ববোধের উষ্ণ আশ্রয়ে ফিরে যেতে পারে, তবেই কেবল এই ভয়াবহ বৈশ্বিক মানসিক মহামারি থেকে স্থায়ী মুক্তি লাভ করা সম্ভব।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!