দেশ যখন হামের ভয়াবহ সংক্রমণ ও শিশু মৃত্যুর মর্মান্তিক বাস্তবতার মুখোমুখি, তখনই বর্ষার শুরুতে ডেঙ্গুর বিস্তার নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতোমধ্যে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে। যদিও এ সংখ্যা এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি, কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলে দেয়, বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে হামের মতোই ডেঙ্গুও একটি বড় জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে।
হামের বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের জন্য একটি কঠিন শিক্ষা। টিকাদান কর্মসূচিতে গাফিলতি এবং সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে কয়েক মাসের ব্যবধানে আক্রান্তের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে এবং শত শত শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। স্বাস্থ্য খাতে এমন সংকট মোকাবিলায় সরকারকে বিপুল চাপের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। ঠিক একই সময়ে ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দেশের ৫০টির বেশি জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। বৃষ্টির কারণে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজনন দ্রুত বাড়ছে। অথচ জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও সমন্বিত কার্যক্রম এখনো দৃশ্যমান নয়। বাস্তবতা হলো, ডেঙ্গু শুধু হাসপাতালের চিকিৎসা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, এর মূল যুদ্ধটি লড়তে হয় মাঠে, মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের মাধ্যমে।
সরকার ডেঙ্গু মোকাবিলায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মশক নিধন কার্যক্রম এবং হাসপাতাল প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সাধারণ জনগণকে একই প্ল্যাটফর্মে এনে কাজ করতে হবে। শুধু মৌসুমি নয়, বছরব্যাপী মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালু করাও জরুরি।
একই সঙ্গে জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। মানুষকে বুঝতে হবে যে নিজের বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব কিংবা আশপাশে জমে থাকা সামান্য পানিও ডেঙ্গুর উৎস হতে পারে। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে।
আমারা মনে করি, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি। রোগী বাড়ার পর হাসপাতালের শয্যা, স্যালাইন বা চিকিৎসক বাড়ানোর চেয়ে রোগের বিস্তার রোধ করা অনেক বেশি কার্যকর। তাই এখনই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার, চিকিৎসা সরঞ্জাম মজুত এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে হবে।
হামের ভয়াবহতা আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছে, জনস্বাস্থ্য সংকটকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও যদি সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে সেটি আরেকটি জাতীয় দুর্যোগে পরিণত হতে পারে। সরকারকে তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সব ধরনের প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ডেঙ্গু যেন কোনোভাবেই হামের মতো আরেকটি ‘ম্যাসাকার’-এর কারণ না হয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই জরুরি দায়িত্ব।
হামের ভয়াবহ সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় সামান্য বিলম্বও কত বড় মূল্য দাবি করতে পারে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা চলবে না। বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার, চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রস্তুতি এবং ব্যাপক জনসচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার অপেক্ষা না করে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই হবে বিচক্ষণতা। কারণ ডেঙ্গু প্রতিরোধে আগাম প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই।

