মুহূর্তের মধ্যে একটি ভূমিকম্প মানুষের নিরাপত্তাবোধকে ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে। সুদৃঢ় অট্টালিকা, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা মানবসভ্যতার গর্ব, সবকিছুই প্রকৃতির এক ঝাঁকুনিতে অসহায় হয়ে পড়ে। বিজ্ঞান ভূমিকম্পের কারণ ব্যাখ্যা করে ভূগর্ভস্থ প্লেটের নড়াচড়ার মাধ্যমে। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে এর তাৎপর্য কেবল ভৌত জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোরআন ও হাদিসে ভূমিকম্পকে কখনো সতর্কবার্তা, কখনো পরীক্ষা এবং কখনো কিয়ামতের নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই একজন মুমিনের জন্য ভূমিকম্প শুধু আতঙ্কের বিষয় নয়, বরং আত্মসমালোচনা, তওবা এবং আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ্য।
কোরআন ও হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, পৃথিবীর বিভিন্ন বিপর্যয় মানুষের জন্য শিক্ষা, সতর্কবার্তা, পরীক্ষা এবং কখনো কখনো অবাধ্যতার পরিণতির স্মারক। তাই ভূমিকম্পকে শুধু একটি ভূতাত্ত্বিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং আত্মসমালোচনা, তওবা ও আল্লাহমুখী হওয়ার একটি সুযোগ হিসেবেও দেখা উচিত।
ভূমিকম্প সম্পর্কে কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি
পবিত্র কোরআনে বহু স্থানে ভূমিকম্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা মানুষের গাফেলতিকে সতর্ক করে বলেন, ‘জনপদের অধিবাসীরা কি এতই নির্ভয় হয়ে গেছে যে, আমার আজাব রাতারাতি তাদের কাছে এসে পড়বে না, যখন তারা ঘুমিয়ে থাকবে?’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৯৭)।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘তোমাদের ওপর যে বিপদ-আপদ আসে, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল; তবে আল্লাহ অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৩০)।
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের পাপ ও অবাধ্যতা অনেক সময় আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে। তবে আল্লাহর রহমত এত ব্যাপক যে তিনি অসংখ্য অপরাধ ক্ষমা করে দেন।
কোরআনে ভূমিকম্পের পরিভাষা
কোরআনে ভূমিকম্প বোঝাতে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘জিলজাল’ এবং ‘দাক্কা’। জিলজাল অর্থ প্রচ- কম্পন বা বারবার কেঁপে ওঠা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যখন পৃথিবী তার ভয়ংকর কম্পনে প্রকম্পিত হবে।’ (সুরা : জিলজাল, আয়াত : ১)।
অন্যদিকে দাক্কা অর্থ প্রচ- আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘কখনো নয়! যখন পৃথিবীকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া হবে।’ (সুরা : ফাজর, আয়াত : ২১)।
ভূমিকম্প : কিয়ামতের একটি নিদর্শন
কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, কিয়ামত যত ঘনিয়ে আসবে, ভূমিকম্পের সংখ্যা তত বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর। নিশ্চয়ই কিয়ামতের ভূকম্পন এক ভয়াবহ বিষয়।’ (সুরা : হাজ্জ, আয়াত : ১)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না ভূমিকম্পের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০৩৬)।
এ হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, ঘন ঘন ভূমিকম্প কিয়ামতের নিকটবর্তী হওয়ার অন্যতম আলামত।
পাপাচার ও ভূমিকম্প : হাদিসের সতর্কবার্তা
রাসুলুল্লাহ (সা.) কিছু সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে যখন গায়িকা, বাদ্যযন্ত্র এবং মদপানের প্রসার ঘটবে, তখন তাদের ওপর ভূমিধস, বিকৃতি এবং পাথর বর্ষণ হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২২১২)।
অন্য এক হাদিসে বিভিন্ন সামাজিক অনাচারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমনÑ আমানতের খিয়ানত, অবৈধ সম্পদ অর্জন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা, অযোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। (তিরমিজি, হাদিস : ১৪৪৭, অর্থগত বর্ণনা)।
তবে মনে রাখতে হবে, নির্দিষ্ট কোনো ভূমিকম্প কোনো পাপের কারণে ঘটেছেÑ এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহই এ বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞাত। কিন্তু এসব ঘটনা মানুষের জন্য সতর্কবার্তা ও আত্মশুদ্ধির উপলক্ষ্যÑ এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।
ভূমিকম্পের সময় একজন মুমিনের করণীয়
ভূমিকম্প বা অন্য কোনো দুর্যোগ দেখা দিলে একজন মুমিনের প্রথম কাজ হলোÑ আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া।
১. তওবা ও ইস্তিগফার করা বেশি বেশি পড়া, ‘আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করি।’
২. দোয়া ও জিকির করা আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা, রহমত ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।
৩. সালাত আদায় করা বিপদের সময় নফল সালাত ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা করা।
৪. আত্মসমালোচনা করা নিজের গুনাহ, অবহেলা ও দায়িত্ব সম্পর্কে চিন্তা করা এবং সংশোধনের চেষ্টা করা।
৫. অসহায় মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
ভূমিকম্প পৃথিবীর অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বৈজ্ঞানিকভাবে এর কারণ ভূগর্ভস্থ প্লেটের নড়াচড়া হলেও একজন মুমিন বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোনো কিছুই সংঘটিত হয় না। তাই প্রতিবার পৃথিবী কেঁপে উঠলে আমাদের মনে রাখা উচিতÑ একদিন এমন এক মহাভূমিকম্প আসবে, যা হবে কিয়ামতের সূচনা। সেদিন কোনো শক্তি, সম্পদ বা ক্ষমতা মানুষকে রক্ষা করতে পারবে না; রক্ষা করবে শুধুমাত্র আমান ও নেক আমল। তাই ভূমিকম্পকে শুধু আতঙ্কের কারণ হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর স্মরণে ফিরে যাওয়ার একটি জাগরণী বার্তা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে তাঁর রহমত ও হেফাজতের ছায়ায় রাখুন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা দান করুন। আমিন।

