ঢাকা বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬

জননিরাপত্তার স্বার্থে আইনের কার্যকর প্রয়োগ প্রয়োজন

আকাশ চৌধুরী, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: জুন ২৪, ২০২৬, ০৭:১৩ এএম

একটি শহরের নিরাপত্তা শুধু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শক্তি দিয়ে নিশ্চিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর, দ্রুত ও সমন্বিত বিচারিক ব্যবস্থা। পুলিশ অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে, তদন্ত করে, প্রমাণ সংগ্রহ করে এবং আদালতে উপস্থাপন করে। কিন্তু যদি সেই অপরাধী বারবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়, যদি গ্রেপ্তারের পরদিনই সে জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধের জগতে ফিরে যায়Ñ তাহলে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়।

সিলেট মহানগর পুলিশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একটি নগরীর শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ দেখতে পেয়েছেÑ অপরাধী গ্রেপ্তার হচ্ছে, মামলা হচ্ছে, কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও জামিনের সুযোগের কারণে অনেক চিহ্নিত অপরাধী আবারও সমাজে ফিরে আসছে। ফলে একই অপরাধী বারবার অপরাধ করছে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, গত নয় মাসে সিলেট মহানগর পুলিশ ৩৫৬ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে মাত্র ১৭ জন বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক অভিযুক্ত ব্যক্তি অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে মুক্ত হয়ে সমাজে ফিরে গেছে। একজন অপরাধী যখন বারবার গ্রেপ্তার হয় এবং দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসে, তখন অপরাধীর মধ্যে আইনের প্রতি ভয় কমে যেতে পারে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়তে পারে। এটি শুধু পুলিশের সমস্যা নয়; এটি একটি সামগ্রিক আইন প্রয়োগ ও বিচার ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ।

অপরাধ দমন শুধু গ্রেপ্তারের বিষয় নয়

একজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা পুলিশের দায়িত্বের একটি অংশ মাত্র। প্রকৃত সফলতা তখনই আসে, যখন অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায় যাতে সে পুনরায় অপরাধ করার সুযোগ না পায়।

একজন ছিনতাইকারী, মাদক ব্যবসায়ী বা মাদকাসক্ত ব্যক্তি যদি বারবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন। কারণ অপরাধের প্রভাব শুধু একজন ভুক্তভোগীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি পুরো সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

একটি ছিনতাই একজন মানুষের দিনের পরিশ্রমের উপার্জন কেড়ে নেয়। একটি মাদক কারবার একটি পরিবারকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে। একটি সহিংস অপরাধ একটি শহরের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে আতঙ্কিত করে তুলতে পারে।

তাই অপরাধ দমনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিতÑ অপরাধ সংঘটনের আগেই প্রতিরোধ সৃষ্টি করা এবং অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

সিলেট মহানগর পুলিশের বিকল্প উদ্যোগ

এই বাস্তবতায় সিলেট মহানগর পুলিশ একটি বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। প্রতিটি থানার অপারেশন টিমের সঙ্গে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যুক্ত করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযানের সময় আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

এই ব্যবস্থায় মাদকসেবী, মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারীসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সাজা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে আইনি প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় থেকে অপরাধীরা দ্রুত বেরিয়ে আসার সুযোগ পাচ্ছে না।

জুন মাসের প্রথম ১৫ দিনে সিলেট মহানগর পুলিশ ১ হাজার ৩০৬ জন অপরাধীকে আটক করেছে। তাদের মধ্যে ৫৫৭ জনকে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয়েছে। সাজা ৭ দিন থেকে শুরু করে ১ বছর পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। এই কার্যক্রমের ফলাফলও দ্রুত দৃশ্যমান হয়েছে।

গণমাধ্যম সূত্র বলছে, জুন মাসের ১ তারিখ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত সিলেট মহানগর এলাকায় কোনো হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি বা ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড হয়নিÑ যা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।

অবশ্যই কোনো স্বল্প সময়ের পরিসংখ্যান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। কিন্তু এটি প্রমাণ করে যে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কেন দ্রুত বিচারিক ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ

অপরাধী যখন জানে যে, অপরাধ করার পর তাকে দ্রুত আইনের মুখোমুখি হতে হবে, তখন তার মধ্যে একটি প্রতিরোধমূলক ভয় তৈরি হয়। আইনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলোÑ আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত হওয়া।

শুধু আইন থাকলেই সমাজ নিরাপদ হয় না; সেই আইন দ্রুত, নিরপেক্ষ ও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হয়। একজন পুলিশ কর্মকর্তা মাঠে কাজ করার সময় প্রতিদিন মানুষের দুঃখ, ভয় এবং অভিযোগের মুখোমুখি হন। একজন মা যখন বলেন, তার সন্তান মাদকের কারণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, একজন ব্যবসায়ী যখন বলেন তার দোকানে নিরাপত্তা নেই, একজন পথচারী যখন সন্ধ্যার পর রাস্তায় চলতে ভয় পানÑ তখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে পুলিশ যদি অপরাধীকে আটক করেও দেখে যে সে পরদিন আবার একই এলাকায় ফিরে এসেছে, তাহলে অপরাধ প্রতিরোধের প্রচেষ্টা দুর্বল হয়ে যায়।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা

বর্তমান বাস্তবতায় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতা ও উপস্থিতি আরও কার্যকর করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

কারণ অনেক ছোট কিন্তু জনজীবনে বড় প্রভাব ফেলা অপরাধÑ যেমন ছিনতাই, প্রকাশ্যে মাদক সেবন, ছোটখাটো বিশৃঙ্খলাÑ এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে অপরাধের বিস্তার অনেক কমানো সম্ভব।

একটি সম্ভাব্য ব্যবস্থা হতে পারেÑ পুলিশ কমিশনারের অধীনে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা, যারা আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। আরেকটি চিন্তা হতে পারেÑ বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রদান করা। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিশ্চিত করতে হবেÑ একই ব্যক্তি যেন একই সময়ে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা এবং বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগকারী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন না করেন। কারণ বিচারব্যবস্থার মূল শক্তি হলো নিরপেক্ষতা।

পুলিশের কাজ হলোÑ অপরাধ উদ্ঘাটন করা, প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা। আর বিচারিক ক্ষমতার কাজ হলো নিরপেক্ষভাবে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেওয়া। এই দুই ভূমিকার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জনগণের নিরাপত্তা বনাম অপরাধীর অধিকার

একটি সভ্য সমাজে অপরাধীর অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার অধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আইনের শাসনের অর্থ হলোÑ কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অপরাধীকে শাস্তি দিতে হবে আইন অনুযায়ী, আবার নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়Ñ এটিও নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ মানে অযাচিত কঠোরতা নয়; বরং বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ।

যদি একজন চিহ্নিত অপরাধী বারবার অপরাধ করে, যদি তার বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ থাকে, যদি সে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করেÑ তাহলে আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ সমাজের স্বার্থেই প্রয়োজন।

পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা

একটি শহরের শান্তি-শৃঙ্খলা শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়; এটি পুলিশ ও জনগণের যৌথ দায়িত্ব।

পুলিশ যখন অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে, তখন জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন। অপরাধ সম্পর্কে তথ্য দেওয়া, সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে আসা এবং সামাজিকভাবে অপরাধকে প্রত্যাখ্যান করাÑ এসব বিষয় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে।

একইভাবে পুলিশকেও নিশ্চিত করতে হবে যে প্রতিটি অভিযান হবে পেশাদার, আইনসম্মত এবং মানবিক। জনগণ যখন দেখবে অপরাধী দ্রুত আইনের আওতায় আসছে এবং নিরপরাধ মানুষ নিরাপদ আছে, তখন পুলিশের প্রতি আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে।

একটি নিরাপদ শহরের জন্য নতুন চিন্তার সময়

সিলেট একটি ঐতিহ্যবাহী, গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় নগরী। এই শহরের মানুষ শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে চায়। তারা চায় ব্যবসা, শিক্ষা, পর্যটন ও সামাজিক জীবন নিরাপদ পরিবেশে এগিয়ে যাক।

নিরাপদ শহর গড়ে তুলতে শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান, দ্রুত আইনি ব্যবস্থা এবং অপরাধ প্রতিরোধের আধুনিক কৌশল। সিলেট মহানগর পুলিশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছেÑ দ্রুত আইন প্রয়োগ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে।

এখন প্রয়োজন এই অভিজ্ঞতাকে আরও পর্যালোচনা করা, আইনগত কাঠামোর মধ্যে এনে আরও শক্তিশালী করা এবং দেশের অন্যান্য মহানগর ও শহরেও জননিরাপত্তার স্বার্থে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলোÑ তার নাগরিকদের নিরাপদ রাখা।

একজন মানুষ যখন রাতে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরতে পারে, একজন মা যখন সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তামুক্ত থাকতে পারেন, একজন ব্যবসায়ী যখন ভয় ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেনÑ তখনই একটি শহর সত্যিকার অর্থে উন্নত ও মানবিক শহরে পরিণত হয়।

আইনের কার্যকর প্রয়োগ, পুলিশের পেশাদারিত্ব এবং দ্রুত বিচারিক ব্যবস্থার সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে সেই নিরাপদ সমাজ। সিলেটের অভিজ্ঞতা হয়তো সেই নতুন পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।