ঢাকা বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬

বিশ্ববাজারের ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ : ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স রপ্তানিতে বিপ্লব ও বাস্তবতা

মো. মোজাম্মেল হক মৃধা, ই-কমার্স উদ্যোক্তা
প্রকাশিত: জুন ২৪, ২০২৬, ০৭:১৪ এএম

বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য ও ডিজিটাল অর্থনীতির ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে। দেশের ক্ষুদ্র, মাঝারি ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের তৈরি পণ্য এখন কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি পৌঁছে যাবে বিশ্বখ্যাত অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোর কোটি কোটি আন্তর্জাতিক ক্রেতার দোরগোড়ায়। গত সোমবার (১৫ জুন, ২০২৬) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ থেকে জারি করা এক যুগান্তকারী সার্কুলারের মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত বা ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স নীতিমালায় বড় ধরনের শিথিলতা আনা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে দেশীয় উদ্যোক্তারা আমাজন, ই-বে, আলিএক্সপ্রেস, টিমু কিংবা ফ্লিপকার্টের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে সরাসরি পণ্য তালিকাভুক্ত করে ‘বিজনেস-টু-কনজ্যুমার’ (ই২ঈ) মডেলে খুচরা বিক্রি করতে পারবেন। এতদিন যা ছিল অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল এবং সাধারণ উদ্যোক্তাদের নাগালের বাইরে।

গ্লোবাল মার্কেট সাইজ : বিশ্ববাজারের বিশাল সম্ভাবনা

আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল বাণিজ্য মাধ্যম। ২০২৬ সাল নাগাদ বৈশ্বিক ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স বাজারের আকার প্রায় *৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার* স্পর্শ করার প্রক্ষেপণ করা হয়েছে, যার বার্ষিক বৃদ্ধির হার (ঈঅএজ) প্রায় ২৫.১%। বিশ্বব্যাপী মোট ই-কমার্স বাণিজ্যের প্রায় ২২% এখন আন্তঃসীমান্ত মডেলে সম্পন্ন হচ্ছে।

বর্তমানে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলো এই বাজারের প্রধান চালিকাশক্তি। ভারতের ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স রপ্তানি ২০২৬ সালের মধ্যে *৮ বিলিয়ন ডলারে* পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এবং তাদের মোট ই-কমার্সের প্রায় ৩৪% ক্রস-বর্ডার। অন্যদিকে, ভিয়েতনামের এসএমই খাতের প্রায় ৩২% উদ্যোক্তা সরাসরি আমাজনের মাধ্যমে রপ্তানি করে। সেখানে এই নতুন ফ্রেমওয়ার্কের সঠিক বাস্তবায়ন হলে আগামী ৩ বছরে বাংলাদেশের ডিজিটাল রপ্তানি আয় সহজেই ৫০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

আইনি ভিত্তি : কোন সরকারি নীতিমালার অধীনে এই সিদ্ধান্ত?

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ঐতিহাসিক সার্কুলারটি মূলত বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত ‘জাতীয় ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা-২০১৮ (সংশোধিত ২০২০)’-এর ৪.৩ অনুচ্ছেদ এবং ‘ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নির্দেশিকা-২০২৪’-এর লক্ষ্য অর্জনে জারি করা হয়েছে। দেশের প্রচলিত ‘বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭’-এর ধারা ২০ এবং ধারা ২৩-এর অধীনে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এই সার্কুলার জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে এটি সরকারের ‘রপ্তানি নীতি ২০২১-২০২৪’-এর অধ্যায় ৪ (রপ্তানি উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ) এবং স্মার্ট ইকোনমি রোডম্যাপের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : এতদিন কেন হয়নি, এখন কেন সম্ভব হচ্ছে?

এতদিন না পারার মূল বাধা : অতীতে আমাদের পুরো রপ্তানি কাঠামো ছিল বড় কনটেইনার-ভিত্তিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল সামষ্টিক অর্থনীতির নীতিনির্ধাকরা ছোট খুচরা পার্সেল রপ্তানিকে মূল বাণিজ্যের অংশ মনে করতেন না। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল মুদ্রা পাচারের আতঙ্ক, যার কারণে অগ্রিম অর্থ ছাড়া পণ্য পাঠানো প্রায় অসম্ভব ছিল। কাস্টমসের সনাতন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, লজিস্টিকস খাতের উচ্চ ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের অনুপস্থিতি আমাদের উদ্যোক্তাদের হাত-পা বেঁধে রেখেছিল।

বর্তমান বাস্তবতায় নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছা : ২০২৬ সালের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দেশে ডলারের তারল্য সংকট এবং রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হওয়াতে রপ্তানি খাতকে বহুমুখীকরণ করা এখন টিকে থাকার ‘সময়ের দাবি’। তবে শুধু সময়ের দাবিই নয়, নীতিনির্ধারক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বের আধুনিক ও ব্যবসাবান্ধব ‘সদিচ্ছা’ না থাকলে দীর্ঘদিনের এই আইনি ও মানসিক জড়তা ভাঙা সম্ভব হতো না। লাখো তরুণ এসএমই উদ্যোক্তার মেধাকে বিশ্ববাজারে উন্মুক্ত করতে না পারলে একটি দেশের ‘স্মার্ট ইকোনমি’ গড়ে উঠতে পারে না।

প্রজ্ঞাপনের মূল ডেটা ও অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় আর্থিক লেনদেন ও কাস্টমস সংক্রান্ত প্রোটোকলে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে:

লেনদেনের সর্বোচ্চ সীমা : একজন উদ্যোক্তা প্রতি চালানে সর্বোচ্চ ৫,০০০ মার্কিন ডলার মূল্যমানের পণ্য সিএফআর শর্তে সরাসরি রপ্তানি করতে পারবেন।

ইএক্সপি ফরম শিথিলকরণ : ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে মুক্তি দিতে ১,০০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের ছোট রপ্তানি চালানের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ‘ইএক্সপি ফরম’ দাখিলের দীর্ঘমেয়াদি বাধ্যবাধকতা সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হয়েছে।

(বাকী অংশ আগামীকাল)

প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব