ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই, ২০২৬

সম্পাদকীয়

প্রবাসী সুরক্ষায় রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা জরুরি

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ১, ২০২৬, ০৪:১০ এএম

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। প্রতি বছর তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এই শ্রমিকদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রশ্নে রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও দায়বদ্ধতা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ে। সম্প্রতি রাশিয়ায় নির্মাণশ্রমিকের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অন্তত ৩০ জন বাংলাদেশি যুবককে ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ সেই প্রশ্নকে আরও গভীর করেছে।

রূপালী বাংলাদেশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার এসব তরুণ বৈধ কাগজপত্রে বিদেশে গেছেন। তাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে ভালো বেতনের চাকরি। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পর তাদের কর্মচুক্তি উপেক্ষা করে সামরিক পোশাক পরিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। কেউ আহত, কেউ নিখোঁজ, আবার কারো জীবিত থাকার নিশ্চয়তাও নেই। পরিবারের সদস্যরা ভিডিওকলে তাদের রক্তাক্ত, আতঙ্কিত মুখ দেখে শুধু একটি আবেদনই জানাচ্ছেন, প্রিয়জনকে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।

এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রথম দায় অবশ্যই দালালচক্র ও সংশ্লিষ্ট অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সির। মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে যারা প্রতারণা করেছে, তারা মানবপাচারের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িত। কিন্তু দায় সেখানেই শেষ নয়। একজন বাংলাদেশি নাগরিক বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার পর কীভাবে নির্ধারিত কর্মস্থলের পরিবর্তে যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে গেলেন, এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্রকেও দিতে হবে।

বিদেশে কর্মী পাঠানোর আগে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, কর্মচুক্তি, কর্মপরিবেশ এবং গন্তব্য দেশের ঝুঁকি যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। কর্মীরা বিদেশে পৌঁছানোর পর তাদের অবস্থান ও কর্মপরিবেশ পর্যবেক্ষণের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা ছিল কি? সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ মিশন কি নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিল? যদি এসব ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকে, তবে তা নিছক প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; এটি নাগরিক সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতারও প্রতিফলন।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব বিমানবন্দর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশে যাওয়া প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক, আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশি প্রতারণা, নির্যাতন বা মানবপাচারের শিকার হলে তাকে উদ্ধারে দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের কর্তব্য। কেবল রেমিট্যান্স গ্রহণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; রেমিট্যান্স যারা পাঠান, তাদের জীবন ও মর্যাদার নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এ মুহূর্তে সরকারের সামনে কয়েকটি জরুরি করণীয় রয়েছে। প্রথমত, রাশিয়া ও ইউক্রেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ভুক্তভোগীদের অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, অভিযোগের সঙ্গে জড়িত দালাল, রিক্রুটিং এজেন্সি এবং তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বিদেশে কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বাংলাদেশি এমন প্রতারণার শিকার না হন।

প্রবাসী শ্রমিকেরা শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যম নন, তারা এই দেশের নাগরিক, তাদের পরিবার আছে, স্বপ্ন আছে, অধিকার আছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে শুধু কয়েকটি পরিবার নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাও।

যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে কয়েকজন শ্রমিকের জীবন, কিন্তু এই আগুনের তাপ রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধকেও স্পর্শ করা উচিত। প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়, এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অঙ্গীকার। তাই এখন সময় এসেছে শুধু সমবেদনা জানানোর নয়, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। কারণ একজন বাংলাদেশি শ্রমিক বিদেশে কাজ করতে যান জীবন গড়তে, যুদ্ধ করতে নয়। তার নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করাই হোক রাষ্ট্রের জবাবদিহির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।