ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই, ২০২৬

স্মার্ট বাংলাদেশের পথে ‘ওয়ান কান্ট্রি, ওয়ান কিউআর’

মো. মোজাম্মেল হক মৃধা, ই-কমার্স উদ্যোক্তা
প্রকাশিত: জুলাই ১, ২০২৬, ০৪:১২ এএম

সবার আগে বাংলাদেশ মূলনীতিকে সামনে রেখেই ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির চূড়ান্ত ধাপে পদার্পণ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে দেশের সামগ্রিক খুচরা ও পাইকারি বাজারে বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত জাতীয় সর্বজনীন পেমেন্ট ব্যবস্থা ‘বাংলা কিউআর’। ফুটপাতের চা বিক্রেতা, ভাসমান হকার, সিএনজি চালক, পাড়ার মুদি বা ওষুধের দোকান থেকে শুরু করে বহুতল শপিংমল কিংবা মেগা সুপারশপÑ ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে যেকোনো আর্থিক লেনদেন করতে গেলেই এখন এই একক কিউআর কোড ব্যবহার করতে হবে। সরকারের এই ক্যাশলেস সোসাইটি গঠনের উদ্যোগ কেবল একটি প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন নয়, এটি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, রাজস্ব খাত এবং মুদ্রাবাজারের এক কাঠামোগত রূপান্তর।

আইনি কাঠামো ও সরকারের নীতিনির্ধারণী প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ এবং সদ্য প্রণীত পেমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট সিস্টেমস অ্যাক্ট, ২০২৪-এর আইনি নীতিমালার আলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই নির্দেশনা জারি করেছে। মূলত ‘স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১’ মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের মোট লেনদেনের ন্যূনতম ৭৫ শতাংশ ডিজিটাল মাধ্যমে রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর আগে বাজারে বিকাশ, নগদ, রকেট কিংবা বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিজস্ব ও আলাদা আলাদা কিউআর কোডের আধিক্য ছিল। একে বলা হতো ‘ক্লোজড-লুপ’ বা বদ্ধ ব্যবস্থা, যা গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করত এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ছিল অত্যন্ত জটিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সার্কুলার অনুযায়ী, ‘ওয়ান কান্ট্রি, ওয়ান কিউআর’ ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি ‘বাংলা কিউআর’ একটি সর্বজনীন ও ইন্টারঅপারেবল বা আন্তঃলেনদেনযোগ্য নেটওয়ার্ক। ফলে একজন ক্ষুদ্র বিক্রেতার কাউন্টারে কেবল একটিমাত্র কিউআর কোড থাকবে, যা স্ক্যান করে দেশের যেকোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপের গ্রাহক তাৎক্ষণিক পেমেন্ট করতে পারবেন।

অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান ও কাগুজে মুদ্রার বিশাল ব্যয়

গবেষণা ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক জার্নাল (যেমনÑ বাংলাদেশ ব্যাংক কোয়ার্টার্লি এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের বাজারে প্রচলিত কাগজের মুদ্রা বা ব্যাংক নোট মুদ্রণ, নিরাপত্তা সুতা সংযোজন, ছেঁড়া-ফাটা ও পুরাতন নোট ধ্বংসকরণ এবং দেশব্যাপী টাকা স্থানান্তরের লজিস্টিকস ও ভল্টিং ব্যবস্থাপনার পেছনে সরকারের বছরে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা অনুৎপাদনশীল ব্যয় হয়।

এ ছাড়াও অর্থনীতির আরও তিনটি বড় সংকট হলো:

১. শ্যাডো ইকোনমি বা ছায়া অর্থনীতি : দেশে মোট লেনদেনের একটি বিশাল অংশ ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে বা অনানুষ্ঠানিক খাতে সংঘটিত হয়। ফলে এই বিপুল অর্থের ওপর সরকার কোনো কর বা ভ্যাট পায় না।

২. রাজস্ব ক্ষতি : ট্র্যাকিং মেকানিজম না থাকায় খুচরা বিক্রয় পর্যায় থেকে প্রকৃত ভ্যাট ও কর আদায় করা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।

৩. নিরাপত্তা ঝুঁকি ও তারল্য সংকট : নগদ টাকার লেনদেনে চুরি, ছিনতাই বা জাল নোটের ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি মানুষের হাতে নগদ টাকা ধরে রাখার প্রবণতার কারণে ব্যাংকগুলোতে অনেক সময় তারল্য সংকট দেখা দেয়।

সর্বস্তরে ‘বাংলা কিউআর’ চালুর প্রক্রিয়া ও টাকা উত্তোলন

রাস্তার ধারের ক্ষুদ্র দোকানদার থেকে করপোরেট শপিংমলÑ সবার জন্য এই ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম চালুর প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সহজ ও সাশ্রয়ী করা হয়েছে:

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মার্চেন্ট অনবোর্ডিং : বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গাইডলাইন অনুযায়ী, ক্ষুদ্র ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের জন্য ‘মাইক্রো-মার্চেন্ট’ অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াই কেবল জাতীয় পরিচয়পত্র এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধির প্রত্যয়নপত্র দিয়ে এই অ্যাকাউন্ট সচল করা যায়।

টাকা উত্তোলন ও ফান্ড ট্রান্সফার : ব্যবসায়ীদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এই টাকা তারা ক্যাশ করবেন কীভাবে? বাংলা কিউআরের মাধ্যমে আসা টাকা সরাসরি ব্যবসায়ীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মার্চেন্ট ওয়ালেটে জমা হয়। ব্যবসায়ী চাইলে কোনো খরচ ছাড়াই সেই ডিজিটাল ব্যালেন্স দিয়ে তার পাইকারি সাপ্লাইয়ার বা সরবরাহকারীকে পেমেন্ট করতে পারবেন।

 লেনদেন খরচ ও চার্জের স্পষ্টতা : প্রচলিত ব্যবস্থার খরচ থেকে মুক্তি।  প্রচলিত মোবাইল ব্যাংকিং বা এমএফএস (যেমন বিকাশ বা নগদ) সেবায় সাধারণ গ্রাহকদের বা এজেন্টদের ক্যাশ-আউটের ক্ষেত্রে ১.৫% থেকে প্রায় ২% পর্যন্ত একটি বড় অঙ্কের খরচ গুনতে হয়। এই উচ্চ ক্যাশ-আউট চার্জের ফাঁদ থেকে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মুক্ত করতে বাংলা কিউআরের ব্যয়ের মডেলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হয়েছে:

 গ্রাহকদের জন্য সম্পূর্ণ ফ্রি : একজন সাধারণ গ্রাহক যখন তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল আর্থিক সেবা (বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায়) অ্যাপ ব্যবহার করে দোকানে বাংলা কিউআর স্ক্যান করে পেমেন্ট করবেন, তখন তার পকেট থেকে অতিরিক্ত কোনো টাকা বা চার্জ কাটা হবে না।

ব্যবসায়ীদের জন্য নামমাত্র এমডিআর : প্রথাগত পিওএস মেশিনের মতো এই কিউআর ব্যবস্থায় কোনো দামি হার্ডওয়্যার মেইনটেইন্যান্সের খরচ নেই। এখানে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর চার্জ অত্যন্ত কম (০.৭% বা তার কম) নির্ধারণের জন্য কাজ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যার একটি বড় অংশ আবার মার্চেন্ট ব্যাংক ও পেমেন্ট নেটওয়ার্কের মধ্যে ভাগ হয়।

সামষ্টিক অর্থনীতি ও রাজস্ব খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এবং সরকারের লাভ।

বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জার্নালের অর্থনৈতিক মডেল অনুযায়ী, কোনো উদীয়মান অর্থনীতিতে ডিজিটাল লেনদেনের হার ১০% বৃদ্ধি পেলে তা দেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে সরাসরি ০.৫% থেকে ০.৮% পর্যন্ত ইতিবাচক অবদান রাখে। বাংলা কিউআর সর্বস্তরে কার্যকর হলে দেশের অর্থনীতিতে নিচের পরিবর্তনগুলো আসবে:

রাজস্ব আদায় দ্বিগুণ হওয়া : সব ধরনের খুচরা লেনদেন যখন ডিজিটাল ট্র্যাকের আওতায় আসবে, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভ্যাট ও করের ফাঁকি বন্ধ হবে। এনবিআরের রাজস্ব আদায় এবং ট্যাক্স-টু-জিডিপি রেশিও যা বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম সর্বনি¤œ, তা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।

 ২২ হাজার কোটি টাকার সাশ্রয় : ক্যাশলেস লেনদেন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে কাগজের নোটের চাহিদা কমে যাবে। ফলে নোট মুদ্রণ ও ব্যবস্থাপনার ২২ হাজার কোটি টাকার সিংহভাগ বাঁচানো সম্ভব হবে, যা সরকারের অনুৎপাদনশীল ব্যয় কমিয়ে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি করবে।

টেকসই বাস্তবায়নে নীতিনির্ধারণী সুপারিশ ও ভবিষ্যৎ অগ্রগতি।

বাংলা কিউআরের এই মহাপরিকল্পনাকে শতভাগ সফল এবং মাঠপর্যায়ে টেকসই করতে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:

১. ট্যাক্স ইনসেনটিভ বা কর প্রণোদনা : গ্রাহক ও ক্ষুদ্র বিক্রেতাদেরকে ক্যাশলেস লেনদেনে অভ্যস্ত করতে সাময়িকভাবে ডিজিটাল পেমেন্টের ওপর ১-২% ক্যাশব্যাক বা কর রেয়াত দেওয়া যেতে পারে, যেমনটি প্রতিবেশী দেশ ভারত তাদের ইউপিআই চালুর শুরুর দিকে সফলভাবে করেছিল।

২. ক্ষুদ্র মার্চেন্টদের জন্য সম্পূর্ণ ফ্রি সিলিং : একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত (যেমন: দৈনিক ১০ বা ২০ হাজার টাকা) ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের লেনদেনকে সম্পূর্ণ ফি-মুক্ত বা জিরো-এমডিআর করা উচিত, যাতে ফুটপাতের বিক্রেতারা কোনো দ্বিধা ছাড়াই এটি গ্রহণ করেন।

৩. ডিজিটাল অবকাঠামো ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট : দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষুদ্র দোকানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। মোবাইল অপারেটরদের মাধ্যমে শুধুমাত্র ‘বাংলা কিউআর’ বা ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহারের জন্য ফ্রি বা অত্যন্ত সাশ্রয়ী বিশেষ ‘ক্যাশলেস ডেটাপ্যাক’ চালু করা যেতে পারে।

৪. আর্থিক সাক্ষরতা ও সাইবার নিরাপত্তা : প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে ডিজিটাল পেমেন্ট অ্যাপ ব্যবহারের নিরাপত্তা, ওটিপি বা পিন গোপন রাখার বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে পেমেন্ট সিস্টেমে কোনো কারিগরি ত্রুটি বা ভুল লেনদেন হলে তা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ২৪/৭ ডেডিকেটেড হেল্পলাইন সক্রিয় রাখা আবশ্যক।

৫. ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও জালিয়াতি রোধ : ডিজিটাল পেমেন্ট ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর ফলে ভুয়া বিক্রেতা, ছদ্মবেশী প্রতারক কিংবা ই-কমার্স খাতের সামগ্রিক জালিয়াতি অনেকাংশে কমে যাবে। প্রতিটি লেনদেনের ডিজিটাল প্রমাণ থাকায় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, যা বাজারে ভোক্তা অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ডিজিটাল কেনাকাটায় বিপুল কনজিউমার ট্রাস্ট বা আস্থা তৈরি করবে।

৬. ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট বা আন্তর্জাতিকীকরণ : বাংলাদেশ ব্যাংকের পরবর্তী অগ্রগতির ধাপ হওয়া উচিত এই কিউআর ব্যবস্থার আন্তর্জাতিকীকরণ। ভারতের ইউপিআই যেভাবে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে, ঠিক তেমনি ভবিষ্যতে আমাদের ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহার করে যেন প্রবাসীরা সরাসরি রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেন এবং বাংলাদেশি পর্যটকরা বিদেশে গিয়ে পেমেন্ট করতে পারেনÑ সেই প্রযুক্তিগত সমন্বয় করা প্রয়োজন। এটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বহুলাংশে কমাবে।

১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হতে যাওয়া সর্বজনীন ‘বাংলা কিউআর’ কেবল একটি আধুনিক পেমেন্ট ব্যবস্থা নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার এক নতুন হাতিয়ার। কাগজের মুদ্রার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক ও ক্যাশলেস সমাজ বিনির্মাণে এটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গেম-চেঞ্জার হিসেবে প্রমাণিত হতে যাচ্ছে।