চার প্রশ্নে আটকে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার বাংলাদেশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। বেনজীরকে বাংলাদেশে ফেরত দিতে হলে দুবাই পুলিশ চায় চারটি প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব। তাদের আইন অনুসারে এটা তারা চাইতেই পারে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, কী জবাব দেবে বাংলাদেশের দুদক? সেসব জবাব খুঁজতে ফাইল খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে দুদক।
বাংলাদেশে চারটি বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া খুব বড় কোনো ঘটনা নয়। এখানে একেকটি বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইতে চাইতে চারটি কমিটি হয়ে যায়, চারটি তদন্ত হয়, আটটি বৈঠক বসে, বারোটি নোটশিট তৈরি হয়। তারপর একদিন দেখা যায়, যে বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল, সেটিই সবাই ভুলে গেছে। কিন্তু এবার ঘটনা একটু আলাদা। ব্যাপারটা দুবাইয়ের। আর সেখানে নাকি পুলিশ অপেক্ষা করছে জবাবের জন্য।
খবরটি শুনেই দেশের প্রশাসনিক মহলে নাকি তৎপরতা শুরু হয়েছে। শুরু হয়েছে ফাইল খোঁজা, নথি গোছানো, পুরোনো কাগজ ঝাড়পোছ করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে, কোন প্রশ্নের উত্তর কত পৃষ্ঠায় দেওয়া হবে, তা নিয়ে বৈঠক।
এক কর্মকর্তা বললেন, চারটা প্রশ্ন, তাই না? আরেকজন বললেন, হ্যাঁ। কর্মকর্তা বললেন, তাহলে চারটা উত্তর দিলেই তো হয়! সঙ্গে সঙ্গে ঘরে নেমে এলো নীরবতা। অভিজ্ঞ এক কর্মকর্তা চশমা নামিয়ে বললেন, আপনি নতুন নাকি? চারটি প্রশ্নের চারটি উত্তর দিলে আমলাতন্ত্রের মান থাকে? এখানে চারটি প্রশ্ন মানে চারটি প্রশ্ন নয়। চারটি প্রশ্ন মানে চারটি দপ্তর। চারটি দপ্তর মানে চারটি ফাইল। চারটি ফাইল মানে ষোলোটি স্বাক্ষর। ষোলোটি স্বাক্ষর মানে আটটি স্মারক। আর আটটি স্মারক মানে, অন্তত তিনটি বৈঠক।
শুরু হলো আসল কাজ। প্রথম প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে পাঁচ পৃষ্ঠায়। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর আট পৃষ্ঠায়। তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র সংযুক্তিসহ। আর চতুর্থ প্রশ্নের উত্তর? ‘বিষয়টি তদন্তাধীন’- এই চার শব্দে!
তবে সমস্যা হলো, দুবাই পুলিশ নাকি সোজাসাপ্টা উত্তর চেয়েছে। কোনো যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে, প্রযোজ্য বিধি মোতাবেক। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন- এসবের সুযোগ নেই। এতে নাকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বেশ চিন্তায় পড়ে গেছেন। কারণ বাংলাদেশের সরকারি দপ্তরে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয় সাধারণত প্রশ্নের জবাব না দিয়ে।
কেউ জিজ্ঞেস করলে, কোথায় ছিলেন? উত্তর আসে, আমি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেছি। প্রশ্ন, কেন ছিলেন? উত্তর, বিষয়টি যথাযথ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়েছে। প্রশ্ন, কীভাবে? উত্তর, বিষয়ে তদন্ত চলছে। আর তদন্ত কোথায়? কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি কবে রিপোর্ট দেবে? উত্তর, যথাসময়ে। সেই যথাসময়টা কখন আসবে? সোজাসাপটা উত্তর, সময় হলে।
কিন্তু দুবাই পুলিশ নাকি এতটা ধৈর্যশীল নয়! তাই এবার নাকি দুদককে বলা হয়েছে সবকিছু গুছিয়ে জবাব তৈরি করতে। সেই জবাব যাবে ইন্টারপোলের মাধ্যমে।
এখন ইন্টারপোলও নাকি একটু দ্বিধায়। এক কর্মকর্তা নাকি বলেছেন, আমরা কি শুধু চিঠি নিয়ে যাব, নাকি সঙ্গে ব্যাখ্যাও নিয়ে যাব? পাশ থেকে আরেকজন বললেন, ব্যাখ্যা যদি বেশি হয়? তাহলে? তাহলে দুবাই পুলিশ আবার চারটি প্রশ্ন করবে। এই আশঙ্কায় নাকি জবাব তৈরির কাজ চলছে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে। কারণ একটি ভুল কমা, একটি ভুল দাঁড়ি, এমনকি একটি ভুল শব্দও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমস্যা তৈরি করতে পারে!
শোনা যাচ্ছে, জবাবের খসড়া তৈরি করতে গিয়ে কয়েকটি সম্ভাব্য শব্দ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। ‘ফেরত’ শব্দটি থাকবে, নাকি ‘প্রত্যর্পণ’? ‘অভিযুক্ত’ বলা হবে, নাকি ‘সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি’? ‘অভিযোগ’ বলা হবে, নাকি ‘অভিযোগসমূহ’? এক কর্মকর্তা নাকি শেষ পর্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলেই ফেলেছেন, ভাই, মানুষটা আগে আসুক। শব্দগুলো পরে ঠিক করে নেব। কিন্তু তাকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারণ রাষ্ট্রীয় নথিতে পরে বলে কোনো শব্দ নেই। সবকিছু আগে ঠিক করতে হয়।
দুদকের কর্মকর্তারা দিন-রাত এক করে জবাব তৈরিতে ব্যস্ত। প্রথম খসড়া তৈরি হলো। দেখা গেল, চারটি প্রশ্নের উত্তর আছে, কিন্তু প্রশ্নগুলোর সঙ্গে মিল নেই। দ্বিতীয় খসড়া হলো। দেখা গেল, প্রশ্নের উত্তর ঠিক আছে, কিন্তু ভাষা এত জটিল যে উত্তর পড়ে প্রশ্নটাই ভুলে যেতে হয়। তৃতীয় খসড়া হলো। সেখানে সব আছে। শুধু জবাব নেই! চতুর্থ খসড়ায় লেখা হলো, বিষয়টি তদন্তাধীন। ব্যস! সবার মুখে হাসি। একজন বললেন, এই তো! এবার পাঠিয়ে দিন। অভিজ্ঞ কর্মকর্তা বললেন, না, না। দুবাইকে পাঠালে তারা আবার জিজ্ঞেস করবে, তদন্ত কবে শেষ হবে? ঘরে আবার নীরবতা।
ওদিকে দুবাই পুলিশও নাকি অপেক্ষায়। তারা ভাবছে, চারটি প্রশ্নের উত্তর আসবে। বাংলাদেশ ভাবছে, চারটি প্রশ্নের উত্তর পাঠানো হবে। ইন্টারপোল ভাবছে, চিঠি পৌঁছে দেওয়া হবে।
আর জনগণ ভাবছে ভিন্ন কিছু। চারটি প্রশ্নের উত্তর পেতে যদি এত আয়োজন, তাহলে প্রশ্ন যদি চল্লিশটি হতো, তাহলে কী হতো? সম্ভবত তখন একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হতো। গঠন করা হতো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি সমন্বয় কমিটি। তারপর একটি উপকমিটি। উপকমিটির জন্য আবার একটি সচিবালয়। সচিবালয়ের জন্য আলাদা অফিস। অফিসের জন্য আসবাবপত্র। আসবাবপত্রের জন্য টেন্ডার। আর সবশেষে? একটি চিঠি। চিঠিতে লেখা থাকত, আপনাদের চারটি প্রশ্নের উত্তর প্রণয়ন প্রক্রিয়াধীন। তত দিনে হয়তো দুবাই পুলিশ আবার চিঠি পাঠিয়ে বলত, আমরা তো চারটি প্রশ্নের উত্তর চেয়েছিলাম। আপনারা কি কোনো উত্তর পাঠাবেন, নাকি উত্তর তৈরির প্রক্রিয়ার অগ্রগতি সম্পর্কে আরেকটি ব্যাখ্যা পাঠাবেন?
আর বাংলাদেশ থেকে জবাব যেত, বিষয়টি সদয় অবগতির জন্য প্রেরণ করা হলো। সঙ্গে ৪৭ পৃষ্ঠার সংযুক্তি। আর সেই সংযুক্তির শেষ পাতায় ছোট করে লেখা থাকত, মূল প্রশ্নের উত্তর পরবর্তী পর্যায়ে জানানো হবে।
আলোচ্য বিষয় নিয়ে সরকারের উচ্চমহলেও শুরু হয়েছে নানা বৈঠক। তদন্তাধীন বিষয় কত দিন তদন্তাধীন রাখা যায়? কেউ বললেন ছয় মাস। কেউ বললেন এক বছর। একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ কর্মকর্তা বললেন, সময় নির্দিষ্ট করলে বিপদ। লিখুন, তদন্ত স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে চলেছে। সাগর-রুনী হত্যা মামলা বা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলাকে উদাহরণ হিসেবে পাঠিয়ে দিন। তবে আসল মজাটা নাকি অন্য জায়গায়। দুবাই পুলিশ জানতে চায়, কেন তাকে ফেরত পাঠানো হবে? বাংলাদেশের উত্তর, তার বিরুদ্ধে মামলা আছে। প্রশ্ন, কী মামলা? উত্তর, দুর্নীতির মামলা। প্রশ্ন, প্রমাণ? উত্তর, তদন্ত চলছে। প্রশ্ন, তদন্তের অবস্থা? উত্তর, তদন্তাধীন।
এ কথা বলে এবার বাংলাদেশের কর্মকর্তারা সবাই নাকি চুপ। কারণ এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আবার নতুন প্রশ্ন উঠতে পারে। আর নতুন প্রশ্ন উঠলে আবার নতুন ব্যাখ্যা। ব্যাখ্যা দিতে গেলে নতুন কাগজ। কাগজ দিতে গেলে নতুন স্বাক্ষর। স্বাক্ষর করতে গেলে নতুন অনুমোদন। আর অনুমোদন নিতে গেলে আরেকটি কমিটি!
আরও একটি ভয়াবহ বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসছে। এই চার প্রশ্নের উত্তর কীভাবে পাঠানো হবে-ডাকযোগে, নাকি মেইলে? সরাসরি হাতে হাতে পৌঁছে দেওয়াটা কি উত্তম নয়? রাষ্ট্রের অনেক গোপন তথ্য আছে এতে। ফাঁস হলে মামলার ক্ষতি হবে। ফলে একটি কমিটি করে তারাই হাতে হাতে এই উত্তরনামা নিয়ে যেতে পারেন। এটাই উত্তম। এখন বিবাদ বেধেছে, কমিটি কত সদস্যর হবে? সবাই দুবাই যেতে চান। তালিকা ছোট করা যাচ্ছে না। সবারই ইচ্ছা এই সুযোগে সোনার খনি হিসেবে পরিচিত দুবাই শহরটা একবার রাষ্ট্রের খরচে ঘুরে আসবেন। আসলে সবারই তো পরিবার আছে, স্ত্রী-কন্যা আছে। তাদেরও তো চাওয়া-পাওয়ার কিছু থাকতেই পারে।
এতক্ষণ যা লিখলাম বা বললাম, অবশ্য সবটাই কাল্পনিক। তবে বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্র যখন কাউকে দেশে ফেরাতে চায়, তখন কাগজপত্র লাগে। আইন লাগে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা লাগে। আর সবচেয়ে বেশি লাগে সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য জবাব। কারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চারটি প্রশ্নের উত্তর শুধু চারটি উত্তর নয়। সেটি কখনো কখনো হয়ে ওঠে একটি রাষ্ট্রের আয়না।
লেখক : সাংবাদিক

