× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

রিন্টু আনোয়ার, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৬, ০২:৪৪ এএম

বৈশ্বিক মন্দা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

রিন্টু আনোয়ার, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৬, ০২:৪৪ এএম

বৈশ্বিক মন্দা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

সাধারণ মানুষ যখন সাময়িক আনন্দে বিভোর, ঠিক তখনই দেশের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি, তৈরি পোশাক খাতে (জগএ) এক নজিরবিহীন বিপর্যয় নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ২০ হাজার পোশাক শ্রমিক তাদের রুটি-রুজির একমাত্র সম্বল চাকরিটি হারিয়েছেন। অন্তত ৮৭টি কারখানা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার প্রত্যাশা ছিল, সেখানে বাস্তবচিত্র সম্পূর্ণ উল্টো ও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) দেশের এই বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘নজিরবিহীন ঝুঁকি’ বা খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকার সঙ্গে তুলনা করেছে। তাদের মতে, এখনই যদি অর্থনীতিতে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার বা সার্জারি করা না হয়, তবে দেশের সামনে এক গভীর অন্ধকার ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।

তৈরি পোশাক কারখানার মালিকরা জানিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে, বিশেষ করে আমাদের প্রধান দুই গন্তব্যÑ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পণ্য কেনার চাহিদা ব্যাপক হারে কমে গেছে। পশ্চিমা বিশ্ব গত কয়েক দশক ধরে যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির শিকার হয়েছে, তা মোকাবিলা করতে তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে সেখানকার সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে এবং তারা পোশাকের মতো বিলাসী বা তুলনামূলক কম জরুরি পণ্যের পেছনে খরচ কমিয়ে দিয়েছেন।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে। নতুন অর্ডারের চরম খরা দেখা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, বায়াররা (বিদেশি ক্রেতা) আগের চেয়ে অনেক কম দামে পোশাক কিনতে চাইছেন, যা আমাদের মালিকদের পক্ষে উৎপাদন খরচ মিটিয়ে সরবরাহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড় বড় কারখানার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে মাঝারি ও ছোট আকারের (ঝগঊ) সাব-কন্ট্রাক্টিং কারখানাগুলো। মূল কারখানাগুলো যখন অর্ডার পাচ্ছে না, তখন সাব-কন্ট্রাক্টিং কারখানাগুলো কাজ না পেয়ে বাধ্য হয়েই ঝাঁপ বন্ধ করে দিচ্ছে, আর রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছেন হাজার হাজার নিরীহ শ্রমিক।

এই বৈশ্বিক মন্দার ওপর ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা। ইরান, ইসরায়েল এবং আমেরিকার মধ্যকার ছায়াযুদ্ধ ও লোহিত সাগরে (জবফ ঝবধ) হুথি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে বিশ্ব বাণিজ্যব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত। এই জলপথটি এশিয়া থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহনের সবচেয়ে ছোট ও সাশ্রয়ী পথ। কিন্তু নিরাপত্তার অভাবে আন্তর্জাতিক জাহাজ কোম্পানিগুলো এখন লোহিত সাগর এড়িয়ে আফ্রিকা মহাদেশের ‘কেপ অব গুড হোপ’ বা উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে ইউরোপে যাচ্ছে।

এই অতিরিক্ত দূরত্বের কারণে আন্তর্জাতিক নৌপথে জাহাজ ভাড়া এক ধাক্কায় প্রায় তিন থেকে চার গুণ বেড়ে গেছে। পাশাপাশি লিড টাইম বা পণ্য পৌঁছানোর সময় বেড়ে গেছে ১৫-২০ দিন। বৈশ্বিক এই অস্থিরতার কারণে ইউরোপের বড় বড় ক্রেতারা এখন বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক নিতে চরম ভয় পাচ্ছেন। কারণ, একদিকে জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধির সংকট, অন্যদিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য ক্রেতাদের হাতে পৌঁছানোর কোনো সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে সময়মতো পণ্য পৌঁছানো না গেলে সিজন বা মৌসুম পার হয়ে যায়, যার ফলে ওই পোশাকের আর কোনো মূল্য থাকে না।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা এতটাই শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা গার্মেন্টস মালিকদের সচল থাকার জন্য নতুন কোনো ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল (ডড়ৎশরহম ঈধঢ়রঃধষ) বা কাঁচামাল কেনার লোন দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। কাঁচামাল না থাকলে শ্রমিকরা কারখানায় বসে কী করবেন? যখন একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা কমতে শুরু করে এবং মানুষ ব্যাংক থেকে নিজেদের আমানত তুলে নিতে শুরু করে, তখন পুরো আর্থিক কাঠামো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। এটি মূলত একটি দেশের অর্থনীতিকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

পোশাক খাতের বিপর্যয়ের পেছনে আরেকটি বড় অনুঘটক হলো তীব্র জ্বালানি সংকট। পোশাক কারখানার বয়লার, ডায়িং ও ওয়াশিং প্ল্যান্টগুলো চালানোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু ডলার সংকটের কারণে সরকার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পর্যাপ্ত এলএনজি (খঘএ) বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করতে পারছে না। ফলে শিল্পাঞ্চলগুলোতে (গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ) গ্যাসের তীব্র হাহাকার চলছে। দিনে ১২-১৪ ঘণ্টাই কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ (চৎবংংঁৎব) থাকছে না। জেনারেটর চালাতে গিয়ে ব্যয়বহুল ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচকে আকাশচুম্বী করে তুলছে। অনেক কারখানা শুধু গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবেই তাদের উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৪০-৫০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। উৎপাদন কমলে আয় কমে, আর আয় কমলেই ছাঁটাইয়ের খড়গ নেমে আসে শ্রমিকের ঘাড়ে।

সহজ কথায় বলতে গেলে, বাজারে যে চাল, ডাল বা ডিমের দাম আগে ১০০ টাকা ছিল, সাধারণ মানুষকে এখন সেই একই পণ্য কিনতে ১২০-১৩০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বাজারে ‘শ্রিন্কফ্লেশন’ (ঝযৎরহশভষধঃরড়হ) বা পণ্যের আকার ছোট করে দাম এক রাখার মতো প্রতারণাও চলছে। অথচ এই আকাশচুম্বী দামের বিপরীতে সাধারণ মানুষের মাসিক আয় বিন্দুমাত্র বাড়েনি, বরং অনেকের কমেছে। ফলে বাধ্য হয়েই দেশের একটি বিশাল মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী এখন ‘নতুন দরিদ্র’ (ঘবি চড়ড়ৎ) শ্রেণিতে পরিণত হচ্ছে। তারা তাদের দৈনন্দিন খাবার তালিকা থেকে প্রোটিন বা পুষ্টিকর খাবার বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। সাধারণ মানুষের এই ত্রাহি মধুসূদন অবস্থার মধ্যেই মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো এসে যুক্ত হয়েছে পোশাক খাতের এই গণছাঁটাই।

বাংলাদেশের মোট ডলার আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশই আসে এই তৈরি পোশাকশিল্প থেকে। পাশাপাশি লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানও এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে মাত্র ছয় মাসে ২০ হাজার শ্রমিকের চাকরি চলে যাওয়া এবং ৮৭টি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মূল ইঞ্জিনে বড় ধরনের গোলযোগ তৈরি হওয়া।

বর্তমানে বাংলাদেশের মোট ডলারের রিজার্ভ কাগজে-কলমে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার দেখানো হলেও, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (ওগঋ) বিপিএম৬ (ইচগ৬) মানদ- অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য বা নিট রিজার্ভের (ঘবঃ জবংবৎাব) প্রকৃত পরিমাণ মাত্র ৩০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি (বা তারও নিচে)। এই সীমিত পরিমাণ অর্থ দিয়ে বড়জোর তিন থেকে চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব, যা আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি সংকেত।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটটি শ্রীলঙ্কার মতো রাতারাতি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার মতো নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে আরও বেশি বিপজ্জনক। এটি হঠাৎ কোনো হার্ট অ্যাটাক নয়, বরং এটি হলোÑ ক্যানসারের মতো, যা অলক্ষ্যে ক্রমাগত পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে মৃত্যু ডেকে আনে।

এই ভয়ংকর অর্থনৈতিক বাস্তবতার সবচেয়ে কালো দিকটি হলোÑ এর সামাজিক প্রভাব। পোশাক খাত থেকে ছাঁটাই হওয়া এই ২০ হাজার সদ্য বেকার হওয়া মানুষগুলো এখন কোথায় যাবেন? এদের একটি বড় অংশই নারী, যারা গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এসে শহরের অর্থনীতিতে অবদান রাখছিলেন। এই নারীদের আয়ে তাদের পুরো পরিবার চলত, ভাই-বোনের পড়াশোনা চলত। গ্রামীণ অর্থনীতিতে ফিরে গিয়ে তাদের নতুন করে কৃষিকাজ করার মতো অনুকূল পরিস্থিতিও এখন আর অবশিষ্ট নেই, কারণ কৃষিতেও যান্ত্রিকীকরণ শুরু হয়েছে।

দেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও ঐতিহ্যবাহী যে তৈরি পোশাকশিল্প গত চার দশক ধরে অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই কাঠামোগত সংকট এখন বিপদের চূড়ান্ত লাল বাতি জ্বালিয়ে দিয়েছে। এ সংকট থেকে উত্তরণের কোনো শর্টকাট জাদুর কাঠি নেই। প্রয়োজন ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা। সেইসঙ্গে  রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত, তৈরি পোশাক খাতকে শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর না করে হাই-অ্যান্ড বা উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরি এবং নতুন বাজার (যেমন: এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা) খোঁজার দিকে মনোযোগী হতে হবে। তৃতীয়ত, শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য দীর্ঘমেয়াদি এবং টেকসই জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করতে হবে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!