ঢাকা শুক্রবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৫

উচ্চ মাধ্যমিক ভর্তিতে কোটা ব্যবস্থা জাতির জন্য লজ্জার

মো. তাহমিদ রহমান
প্রকাশিত: আগস্ট ২৯, ২০২৫, ০৯:৪৪ এএম
মো. তাহমিদ রহমান

একটি রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো তার নাগরিকদের সমান অধিকার নিশ্চিত করা। শিক্ষার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ লাভ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। তবে সমাজের কিছু পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে আনতে রাষ্ট্র অনেক সময় কোটা বা সংরক্ষণ নীতির আশ্রয় নেয়। প্রাথমিকভাবে এর উদ্দেশ্য ইতিবাচক হলেও সময়ের পরিক্রমায় এই কোটা ব্যবস্থা আমাদের রাষ্ট্রে একটি বৈষম্যমূলক, অদক্ষতা ও অসাম্য বর্ধক ব্যবস্থায় পরিণত হয়ে উঠেছিল। চাকরি ও শিক্ষা ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থার কারণে সৃষ্ট বৈষম্যের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছিল দেশের সর্বস্তরের জনগণ। সাম্প্রতিক অতীতে তীব্র আন্দোলনের মুখে সরকারি চাকরিতে সব ধরনের কোটা বাতিল করা হলেও চলতি বছর একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তিতে কোটা বহাল রয়েছে।

যে কোটা বাতিলের আন্দোলন থেকে নাস্তানাবুদ হয়ে বিগত প্রতাপশালী ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে গেছে সেই কোটার অভিশাপ এখনো উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ভর্তি কার্যক্রমে বিদ্যমান। কোটা সংস্কার আন্দোলনে বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে বিগত সরকার প্রাণহানি ঘটিয়েছে অনেক। অথচ সেই কোটার ভয়াল গ্রাস থেকে এখনে মুক্ত হতে পারেনি একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে কলেজে একাদশ শ্রেণির ভর্তিতে কোটা নিয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র বিতর্ক। বিগত দিনে এই কোটার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি নীতিমালার ৩.২নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে কলেজ/সমমানের প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কলেজ/সমমানের প্রতিষ্ঠানের ৯৩% আসন সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে যা মেধার ভিত্তিতে নির্বাচন করা হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা/কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য ১% এবং অধীনস্থ দপ্তর/সংস্থায় কর্মরত কর্মকর্তা/কর্মচারীদের সন্তানদের ক্ষেত্রে ১% সহ মোট ২% আসন মহানগর, বিভাগীয় ও জেলা সদরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা থাকা সাপেক্ষে সংরক্ষিত থাকবে। যদি আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি হয় সেক্ষেত্রে তাদের নিজেদের মধ্যে মেধার ভিত্তিতে ভর্তির সুযোগ পাবে। আবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা/কর্মচারী কর্তৃক দপ্তর প্রধানের প্রত্যয়নপত্র দাখিল করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিজস্ব দপ্তরের প্রধান হলে সেক্ষেত্রে তার একধাপ উপরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার প্রত্যয়নপত্র দাখিল করতে হবে। কোটা পদ্ধতির প্রথমদিকের উদ্দেশ্য ছিল সমাজের উপেক্ষিত গোষ্ঠীকে মূল স্রোতে আনা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একটি অকার্যকর, অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থা চালু থাকায় এখন তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি হয়ে উঠেছে।

উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিতে ২% কোটা বরাদ্দ রাখা হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দপ্তর-সংস্থার জন্য। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে চাকরিরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজের পিছিয়ে পরা উপেক্ষিত জনগোষ্ঠী তা আমার বোধগম্য নয়। প্রকৃতপক্ষে প্রাপ্য নন, এমন ব্যক্তিদের সন্তানরাও এর সুযোগ নিয়ে রাজধানীর নামিদামি কলেজে অনায়াসে ভর্তি হয়েছে। আসন্ন শিক্ষাবর্ষে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে ৩০ জুলাই। তিন দফায় চলবে মাইগ্রেশন প্রক্রিয়া। ভর্তির কাজ শেষ করে একাদশ শ্রেণিতে ক্লাস শুরু হবে আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর।

সারা দেশে তীব্র আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের মুখে সরকারি চাকরিতে সব ধরনের কোটা বাতিল করার পরেও একাদশ শ্রেণির ভর্তি নীতিমালায় কোটা বহাল রাখা দ্বৈতনীতি নয় কি? শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধীনস্ত দপ্তর-সংস্থার ২ শতাংশ কোটার জন্য ২৮টি দপ্তরের তালিকা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই ২৮টি দপ্তরের মধ্যে রয়েছে— বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি), শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, এনটিআরসিএ, ব্যানবেইস, জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম), আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডসহ সরকারি স্কুল, সরকারি কলেজ, সরকারি স্কুল-অ্যান্ড-কলেজ এবং সরকারি শিক্ষা অফিসে কর্মরত শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের সন্তানেরা। এ তালিকা নিয়েও বিতর্ক থেকে যায়। কারণ তালিকার প্রথমেই রয়েছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং দ্বিতীয় বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের নাম। জাতীয় সংসদে পাস হওয়া পৃথক আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এসব প্রতিষ্ঠান স্বায়ত্তশাসিত।

কোনোভাবেই এগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর বা সংস্থা নয়। তালিকার থাকা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটও পৃথক আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ও গবেষণা একাডেমি (নেকটার), মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট সরাসরি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অধীনস্ত দপ্তর বা সংস্থার মধ্যে পড়ে না। এ তালিকায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডসহ (এনসিটিবি) দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের নাম রয়েছে। আইন অনুসারে, প্রতিটি শিক্ষা বোর্ড স্বায়ত্তশাসিত। কোটায় ভর্তিতে মন্ত্রণালয় ও অধীনস্ত দপ্তর, সংস্থার সংজ্ঞায় না পড়লেও এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের সন্তানরাও অনায়াসে কোটার সুযোগ পাবে। দেশের সিংহভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয় সেই বেসরকারি শিক্ষকগনের নিজের সন্তানের ভর্তির জন্য কোটা পাবেন না। যা একধরনের প্রহসন।

একাদশ শ্রেণির ভর্তিতে কোটা নিয়ে গৃহীত সরকারের সিদ্ধান্ত সঠিক ও সুবিবেচিত হয়নি। এর মধ্য দিয়ে কি জুলাই শহিদের অবদানকে তুচ্ছজ্ঞানও করা হচ্ছে না? জরুরি ভিত্তিতে এর সংশোধন দরকার। উচ্চশিক্ষায় উপনীত হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ কলেজ। সেই কলেজে ভর্তির শুরুতেই যদি কোটার মাধ্যমে বৈষম্য তৈরি করা হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা জন্মাবে। সরকারের এই দ্বৈতনীতি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

যেকোনো ধরনের কোটা ব্যবস্থা সাময়িক সময়ের জন্য কার্যকর হতে পারে, যদি তার উদ্দেশ্য হয় পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মূলধারায় নিয়ে আসা। যেহেতু একাদশ শ্রেণির ভর্তিতে যাদের জন্য কোটা বরাদ্দ রাখা হয়েছে তারা কোনোভাবেই পিছিয়ে পরা জনগোষ্ঠী নয়।  তাই একজন শিক্ষক ও অভিভাবক হিসেবে নীতিনির্ধারকদের কাছে প্রত্যাশা রইল একাদশ শ্রেণির ভর্তিতে যে কোটা ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়েছে তা বাতিল করা। সেই সঙ্গে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তির নীতিমালায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

মো. তাহমিদ রহমান
শিক্ষক ও কলামিস্ট