যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হওয়ার প্রথম পদক্ষেপটি শুরু হয় একটি বৈধ স্টুডেন্ট ভিসার মাধ্যমে। এই ধাপে সফল হতে হলে আবেদনকারীকে অবশ্যই যুক্তরাজ্যের কোনো লাইসেন্সপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ভর্তির অফার লেটার এবং স্টাডিজের জন্য স্বীকৃতির নিশ্চয়তা বা ক্যাস (ঈঅঝ) সংগ্রহ করতে হয়। এর পাশাপাশি নিজস্ব ইংরেজি ভাষার দক্ষতা প্রমাণ করা এবং পড়াশোনার খরচসহ জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক তহবিল প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক। তবে মনে রাখা জরুরি যে, এই ভিসাটি সম্পূর্ণ সাময়িক এবং পড়াশোনা চলাকালীন সপ্তাহে মাত্র ২০ ঘণ্টা কাজ করার অনুমতি দেয়। অভিবাসন আইনের জটিলতার কারণে স্টুডেন্ট ভিসায় কাটানো সময়টি সরাসরি স্থায়ী বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় পাঁচ বছরের মেয়াদে গণনা করা হয় না। বিস্তারিত জানাচ্ছেন যুক্তরাজ্যের অভিবাসী আশরাফুল ইসলাম হাসিব স্নাতক সম্পন্ন করার পর কাজের ভিসা
শিক্ষা জীবন শেষ করার পর সরাসরি কাজের জগতে প্রবেশের সুযোগ করে দেয় গ্র্যাজুয়েট ভিসা। স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা দুই বছর এবং পিএইচডি সম্পন্নকারীরা তিন বছরের জন্য এই ভিসার আবেদন করতে পারেন। এই সময়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, কোনো নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার স্পনসরশিপ ছাড়াই যেকোনো ধরনের চাকরিতে যোগ দেওয়া বা প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মস্থল পরিবর্তন করা যায়। যদিও এই গ্র্যাজুয়েট ভিসা সরাসরি স্থায়ী বসবাসের বা আইএলআর আবেদনের সুযোগ দেয় না, তবুও এটি একজন শিক্ষার্থীর জন্য একটি শক্তিশালী ক্যারিয়ার গড়ার সেতু হিসেবে কাজ করে। মূলত এই সময়েই দক্ষ কোনো নিয়োগকর্তা খুঁজে নিতে হয় যারা পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদী স্পনসরশিপ প্রদান করতে সক্ষম।
দক্ষ কর্মী ভিসা বা স্কিলড ওয়ার্কার ভিসায় রূপান্তর
যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে থিতু হওয়ার জন্য সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো দক্ষ কর্মী ভিসা বা স্কিলড ওয়ার্কার ভিসা। গ্র্যাজুয়েট ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই একজন প্রার্থীকে এমন একটি কোম্পানিতে চাকরি নিশ্চিত করতে হয় যাদের স্পনসর লাইসেন্স রয়েছে। এক্ষেত্রে চাকরিটি অবশ্যই সরকারের যোগ্য পেশার তালিকায় থাকতে হয় এবং নির্ধারিত ন্যূনতম বেতনের সীমা পূরণ করতে হয়। এই ভিসার গুরুত্ব অপরিসীম কারণ এর অধীনে কাটানো সময় সরাসরি স্থায়ী বসবাসের জন্য গণনা করা হয়। স্থায়ী বসবাসের আবেদনের যোগ্য হতে হলে একজন ব্যক্তিকে এই ক্যাটাগরির ভিসায় একটানা পাঁচ বছর সফলভাবে অতিবাহিত করতে হয়।
স্থায়ী বসবাসের আবেদন বা আইএলআর অর্জন
স্কিলড ওয়ার্কার ভিসায় বা অন্য কোনো যোগ্য রুটে একটানা পাঁচ বছর বসবাসের পর একজন ব্যক্তি অনির্দিষ্টকালের জন্য থাকার অনুমতি বা আইএলআর (ওখজ) পাওয়ার যোগ্য হন। এই আবেদনের প্রধান শর্ত হলো গত পাঁচ বছরে বছরে ১৮০ দিনের বেশি যুক্তরাজ্যের বাইরে থাকা যাবে না। এ ছাড়া আবেদনকারীকে ‘লাইফ ইন দ্য ইউকে’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয় এবং প্রয়োজনীয় ইংরেজি ভাষার দক্ষতা ও নির্দিষ্ট বেতনের শর্ত বজায় রাখতে হয়। একবার আইএলআর অর্জিত হয়ে গেলে ভিসার যাবতীয় বিধিনিষেধ উঠে যায় এবং কোনো প্রকার স্পনসরশিপ ছাড়াই যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস ও অবাধে কাজ করার অধিকার তৈরি হয়।
চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব লাভ
আইএলআর পাওয়ার পর চূড়ান্ত ধাপটি হলো ব্রিটিশ নাগরিকত্বের আবেদন। সাধারণত স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার ১২ মাস পর এবং যুক্তরাজ্যে মোট বসবাসের মেয়াদ প্রায় ৬ বছর বা তার বেশি হলে এই আবেদন করা যায়। নাগরিকত্বের জন্য আবেদনকারীর চরিত্রের রেকর্ড ভালো হতে হয় এবং ব্রিটিশ মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হয়। নাগরিকত্ব পাওয়ার পর একজন ব্যক্তি ব্রিটিশ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পারেন এবং দেশটিতে একজন পূর্ণ নাগরিক হিসেবে ভোটাধিকারসহ যাবতীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক সুবিধা ভোগ করেন।
বিকল্প রুট ও দীর্ঘ বসবাসের সুবিধা
মূল ধারার বাইরেও পরিস্থিতি ভেদে আরও কিছু পথে যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হওয়া সম্ভব। যেমন স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা কর্মীদের জন্য বিশেষ ভিসা রুট রয়েছে যেখানে খরচ কম এবং প্রক্রিয়াটি তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন হয়। আবার যারা অত্যন্ত মেধাবী বা গবেষক, তাদের জন্য গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসা একটি সম্মানজনক মাধ্যম। এছাড়া কেউ যদি কোনো ব্রিটিশ নাগরিককে বিবাহ করেন তবে তিনি পারিবারিক রুটে স্থায়ী হতে পারেন। অন্যদিকে, যদি কেউ যেকোনো বৈধ ভিসায় (যেমন স্টুডেন্ট, গ্র্যাজুয়েট এবং ওয়ার্ক ভিসা মিলিয়ে) একটানা ১০ বছর যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেন, তবে তিনি ‘লং রেসিডেন্সি’ নিয়মের আওতায় সরাসরি স্থায়ী বসবাসের আবেদন করতে পারেন।
বাস্তবসম্মত সময়রেখা
একজন শিক্ষার্থীর জন্য দেশটিতে পা রাখা থেকে শুরু করে নাগরিকত্ব পাওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে সাধারণত ৭ থেকে ১০ বছর সময় লাগে। যেমন তিন বছরের স্নাতক শিক্ষা, দুই বছরের গ্র্যাজুয়েট ভিসা এবং পাঁচ বছরের দক্ষ কর্মী ভিসার সমন্বয়। এই দীর্ঘ সময়ে মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি যে, অভিবাসন নিয়ম বা বেতনের সীমা যেকোনো সময় পরিবর্তিত হতে পারে। তাই প্রতিনিয়ত আইনি আপডেট সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং নিজের বৈধ অবস্থান বজায় রাখা সফলভাবে স্থায়ী হওয়ার প্রধান শর্ত।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন