ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

স্বপ্ন সংগ্রাম

অনিশ্চয়তার দীর্ঘ গল্প

ওমর ফারুক
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১, ২০২৫, ০২:৪৭ এএম

বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে বহু দশক ধরে তাড়িত করে আসছে। উন্নত জীবনের প্রত্যাশা, দারিদ্র্য থেকে মুক্তি, পরিবারকে আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়াÑ এমন বহু কারণে দেশে-বিদেশে ভিন্ন জীবন খুঁজতে ছুটে যান হাজারো মানুষ। কিন্তু সবার ভাগ্যে বৈধ পথের সুযোগ থাকে না। ফলে অনেকেই হাত বাড়ান দালালচক্রের দিকে, ঝুঁকিপূর্ণ পথে পাড়ি জমান অজানা দেশে। তাদের যাত্রা শুরু হয় স্বপ্ন নিয়ে, শেষ হয় অনিশ্চয়তা, ভয় আর মানসিক যন্ত্রণায়।

নিশ্চয়তার পথ ছেড়ে অনিশ্চয়তায় ঝাঁপ কেউ ভিটে-মাটি বিক্রি করে, কেউ ধার করে, কেউ পরিবারের সঞ্চয় শেষ করে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেন। দালালরা দেখান আকর্ষণীয় ছবি, উচ্চ বেতনের চাকরি, আধুনিক জীবন, দ্রুত উপার্জনের সুযোগ। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের পাঠানো হয় বৈধ ভিসা ছাড়াই বা ‘ভিজিট ভিসা’কে কাজের ভিসা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।

মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কিংবা ইউরোপে পৌঁছাতেই শুরু হয় দুঃস্বপ্নের বাস্তব। সীমান্তে ধরা পড়া, আটক হওয়া বা ফেরত পাঠানোর ঝুঁকি থাকে প্রতিনিয়ত। অনেকেই পৌঁছে যান এমন দেশে, যেখানে তাদের শনাক্ত করার উপায় নেই; পরিচয় নেই, বৈধতা নেই, নিরাপত্তাও নেই।

অন্ধকারের ভেতর আলোর খোঁজ

বিদেশে যাওয়ার সময় বলা হয়েছিল, চাকরি নিশ্চিত। কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখা যায় কাজ নেই, থাকার জায়গা নেই, প্রতিশ্রুত বেতনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। অনেকে নির্মাণশ্রমিক, গৃহকর্মী, কারখানার সাধারণ শ্রমিক বা ছোটখাটো দোকানে অদৃশ্য শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। বেতন কম, কাজের সময় বেশি, কঠোর নিয়ন্ত্রণ আর ভয়ই তাদের নিত্যসঙ্গী। অবৈধ থাকার কারণে তাদের অভিযোগ করার সুযোগ নেই, অধিকার দাবি করার সাহস নেই। কাজের জায়গায় অত্যাচার, বেতন না পাওয়া বা হুমকি-ধমকি সবই নীরবে সহ্য করতে হয়। কারণ একটাই, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখে ধরা পড়লেই গ্রেপ্তার, নির্যাতন বা ফিরতে হবে দেশে।

দালালের জালে বন্দিজীবন

বেশকিছু দেশে অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ চলে  স্পনসরশিপ সিস্টেমের মাধ্যমে। যাদের কাগজপত্র নেই, তারা স্পনসরের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। অনেক সময় স্পনসরদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েন তারা, পাসপোর্ট আটকে রাখা, স্বাধীনভাবে কাজ বদলাতে না পারা, অতিরিক্ত শারীরিক ও মানসিক চাপ, সবই তাদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। দালালচক্রও বিদেশে বসে কার্যক্রম পরিচালনা করে। ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করলেই নতুন করে টাকা দাবি, হুমকি, এমনকি প্রতারণা করে জিম্মি বানানোর মতো ঘটনা ঘটে।

অন্ধকারে থেকে পরিবারে রেমিট্যান্সের আলো অবৈধ প্রবাসী হওয়ার যন্ত্রণার কথা বেশিরভাগ পরিবার জানেই না। পরিবারে টাকা পাঠানোই তাদের একমাত্র সান্ত¡না। পরিবার ভাবে, বিদেশে হয়তো ভালো আছেন; অথচ সত্য হলোÑ প্রতিদিনই তারা অনিশ্চয়তা, ভয়ের মধ্যে দিন কাটান। পুলিশি অভিযানের খবর শুনলে আতঙ্কে লুকিয়ে থাকতে হয়, কখনো বাথরুমে, কখনো ঘরের ছাদে, কখনো পরিত্যক্ত গুদামে। মাসের পর মাস বাড়ির বাইরে বের হতে না পারা, চিকিৎসা না পাওয়া, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারাÑ এসবই মানসিক চাপ জন্ম দেয়। অনেকেই দীর্ঘদিন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে না পেরে ডিপ্রেশনে ভোগেন।

নোম্যান্সল্যান্ডের জীবন

অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়া মানেই মৃত্যুঝুঁকি বহন করার সমান। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে শত শত মানুষ নৌকাডুবিতে মারা যান; মরুভূমি পাড়ি দিতে গিয়ে তৃষ্ণায় বা রোগে প্রাণ হারান কেউ কেউ। দালালরা পালাতে না দিতে শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটায় প্রায়ই। মৃত্যুর পরও অনেক সময় লাশ দেশে ফেরত আনার উপায় থাকে না, কারণ তার বৈধ পরিচয় বা কাগজপত্র থাকে না। সবচেয়ে বড় কষ্ট, পরিবার শেষবারের মতো প্রিয় মুখটিও দেখতে পারে না।

আইনি বৈধতা পাওয়ার দীর্ঘ সংগ্রাম

অনেক দেশ মানবিক বিবেচনায় অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন সঠিক কাগজপত্র, ফি, সময় এবং জটিল প্রক্রিয়া।

সব অভিবাসী এ সুযোগ পান না। আবার অনেকেই ভয় পান, বৈধতার আবেদন করতে গেলে আগে গ্রেপ্তার হতে পারেন। কেউ কেউ দেশে ফিরে আসেন, কিন্তু দেশে এসে শুরু হয় নতুন সংগ্রাম, ঋণের বোঝা, সমাজের লজ্জা, ব্যর্থতার তীব্র চাপ।

বাংলাদেশে অবৈধ অভিবাসনের সবচেয়ে বড় ধাপটি শুরু হয় দেশ ছাড়ার আগেই। বিভিন্ন জেলার বাড়িঘর, খামারবাড়ি বা সঞ্চয় বিক্রি করে মানুষ জোগাড় করেন কয়েক লাখ টাকা। দালালচক্র তাদের দেখায় ইউরোপ, মালয়েশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের সহজ রাস্তা যেখানে নাকি ভিসা লাগবে না, ধরা-খাওয়ার ভয় নেই, পৌঁছালেই নাকি চাকরি নিশ্চিত। কিন্তু শুল্কবিভাগ, ইমিগ্রেশন বা বিদেশি বিমানবন্দরে পৌঁছেই শুরু হয় বিপদ।

প্রতি বছর শত শত বাংলাদেশি অবৈধভাবে মালয়েশিয়া, লিবিয়া, দুবাই, সৌদি আরব বা ইউরোপগামী ফ্লাইটে ভুয়া কাগজপত্র নিয়ে ধরা পড়েন। কখনো নকল পাসপোর্ট, কখনো ওভারস্টে ভিসা, কখনো আবার ট্রানজিট ভিসায় গন্তব্য দেশ পরিবর্তনের পরিকল্পনা। বিমানবন্দরেই আটক হয়ে তাদের ফেরত পাঠানো হয়, যে মানুষটি ভেবেছিলেন বিদেশে গিয়েই সব বদলে যাবে, তিনি ফিরে আসেন লজ্জা, হতাশা ও ঋণের বোঝা নিয়ে।

৯০ দশকে এমন ঘটনা শোনা যেতে যে, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের কথা বলে দালালরা চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার নামিয়ে রেখে চলে যেত। এখন সময় পাল্টেছে। দালালরা আর সেই সুযোগ পায় না। কিন্তু  অনেকে লিবিয়া বা দুবাই হয়ে ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্নে মানব পাচারকারীদের হাতে জিম্মি হন। পরিবারকে ফোনে কান্নাভেজা কণ্ঠে মুক্তিপণ দিতে হয়। ধরা পড়লে জেল, জরিমানা, নির্বাসন সবই তাদের জীবনে নতুন দুঃস্বপ্ন যোগ করে।

লুকানো ব্যথার গল্প

দেশে ফিরে আসার পরে শুরু হয় আরেক যুদ্ধ। গ্রামের মানুষ যাকে বিদেশে যাওয়ার জন্য বিদায় দিয়েছিল, তাকেই এখন ব্যর্থতার চোখে দেখে। ঋণের টাকা শোধ করতে না পারা, আত্মীয়-স্বজনের কটূক্তি, কাজের অভাবÑ সব মিলিয়ে এদের মানসিক অবস্থা ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অনেকে এ লজ্জার ভয়ে ঘটনাটি লুকিয়ে ফেলেন, আবার কেউ আবার দালালদের কাছে আরও টাকা দিয়ে দ্বিতীয়বার চেষ্টা করেন, যা তাদের আরও গভীর বিপদের দিকে ঠেলে দেয়। অবৈধ প্রবাসীরা শুধু শ্রমিক নন, তারা কোনো দেশের অদৃশ্য অর্থনীতির সবচেয়ে কঠোর পরিশ্রমী মানুষ। কিন্তু পরিচয়হীনতার কারণে তাদের জীবনযাপন হয় ছায়ায় লুকিয়ে থাকা এক অদেখা যুদ্ধের মতো। স্বপ্ন দেখেছিলেন উজ্জ্বল ভবিষ্যতের, কিন্তু বাস্তবতা ঠেলে দিয়েছে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে।

তবুও তারা লড়েন, কারণ তাদের পেছনে রয়েছে পরিবার, মায়ের মুখ, বাবার আশা, সন্তানের ভবিষ্যৎ। এ লড়াই শুধু ব্যক্তিগত নয় এটি একটি সমাজের, একটি রাষ্ট্রের, নাগরিকদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার সংগ্রামও।