বাংলা গানের ইতিহাসে সৈয়দ আবদুল হাদী এক অনন্য উচ্চতার নাম। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে অসংখ্য কালজয়ী গান উপহার দিয়ে তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, হয়ে উঠেছেন একটি সাংস্কৃতিক যুগের প্রতিনিধি। ব্রিটিশ আমলের শৈশব, পাকিস্তান পর্বের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের উত্থান-পতনের সাক্ষী এই কিংবদন্তি শিল্পী জীবনের ৮৫ বছরে দেখেছেন সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির বিস্ময়কর রূপান্তর।
একুশে পদক ও একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এই শিল্পীকে সম্প্রতি বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেছে শিল্পকলা একাডেমি। রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে এই বরেণ্য শিল্পী কথা বলেছেন বর্তমান সময়ের গান, ভাইরাল সংস্কৃতি, শিল্পের অবক্ষয়, তরুণ প্রজন্ম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), চলচ্চিত্রের গানে কথিত সিন্ডিকেট এবং নিজের দীর্ঘ জীবনের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে। এই আলাপচারিতায় তিনি যেমন বর্তমান সংগীতচর্চার কিছু সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন, তেমনি তরুণদের সম্ভাবনার প্রতিও আস্থা রেখেছেন। সংগীতের এই কিংবদন্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ওমর ফারুক
এখনকার গান কতটা আবেগ ছুঁতে পারে?
আগে আমরা চিন্তা করতাম একটা গানকে কীভাবে শিল্পসম্মত-মানসম্মত করে তৈরি করা যায়। এখন তো এ ব্যাপারগুলোর ওপর জোর দেওয়া হয় না। আর এখনকার সময় চিন্তা থাকে কীভাবে গানটাকে ভাইরাল করা যায় এবং মানুষকে জোর করে গেলানো বা খাওয়ানো যায়। সত্যি কথা বলতে বেশিরভাগ গানে সেই আবেগ খুঁজে পাই না।
নিজেদের জাহির করার একটা প্রবণতা কি এখন বেশি?
সেটা তো সবারই থাকে। তবে এই সময়ের শিল্পীদের ভেতর একটা প্রবণতা থাকে যেভাবেই হোক, একটা কিছু প্রকাশ করতে হবে, সেটা শিল্প হোক বা অশিল্প, স্থূল হোক বা সূক্ষ্ম। আজকাল স্থূলতার আশ্রয় নিয়েই অনেক গান ভাইরাল হয়। আর এই প্রবণতা সবার মাঝেই থাকে। খোদ মাইকেল জ্যাকসনেরও এই খায়েশটা হয়েছিল। তার প্রথম দিকের গানগুলো অসাধারণ ছিল, মনোযোগ দিয়ে শুনলে কান্না চলে আসত। কিন্তু তারও ভাইরাল হওয়ার ইচ্ছা হলো। ভাইরাল হওয়ার জন্য সে অ্যাক্রোবেটিকের আশ্রয় নিল। সে গানের ১২টা বাজিয়ে দিয়ে গেছে। সে বুঝতেই পারেনি অ্যাক্রোবেটিক তো আর গানের সঙ্গে মেশানো যায় না। আমি মনে করি সংগীত তার নিজস্ব গুণেই মানুষের মনে বেঁচে থাকে, এর জন্য অন্য কিছুর আশ্রয় নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বাংলা সংগীত এমন দৈন্যদশায় পড়েনি যে তাকে অন্য কোনো কিছুর আশ্রয় নিতে হবে।
অনুমতি ছাড়া অন্যের গান ব্যবহারের ঘটনা নিয়ে কী বলবেন?
এই ব্যাপারে আমার কোনো বক্তব্য নেই। আমি কিছু বলতে চাই না। পরবর্তী প্রজন্ম ঠিকই বুঝবে যে গানের সঙ্গে কীভাবে প্রতারণা করা হচ্ছে।
আপনাদের সঙ্গে এখনকার প্রজন্মের পার্থক্য কী দেখেন?
মানুষের সবচেয়ে সুন্দর সময় হলো তার শৈশব ও কৈশোর। আমার শৈশব ও কৈশোরের বেশকিছু সময় কেটেছে ব্রিটিশ আমলে। আমাদের সময় এখনকার মতো ইন্টারনেট বা ভিডিও গেম ছিল না। আমরা ছিলাম প্রকৃতির অনেক কাছাকাছি। এখনকার ছেলে-মেয়েরা কত দুর্ভাগা! এদের প্রকৃতির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা মাঠে খেলতাম, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম; গাছে উঠে ফল পেড়ে খেতাম। প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তা মানুষের জীবনের ওপর দারুণ প্রভাব ফেলে। আমি এখনো প্রকৃতিপ্রেমী এবং সুযোগ পেলেই প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করি।
ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ তিন অধ্যায়ের সাক্ষী হিসেবে আপনার অনুভূতি কী?
পাকিস্তান নামক নতুন দেশ হওয়ার পর মানুষের মনে অনেক আশা-আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে আমরা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাঙালি হিসেবে বঞ্চিত হতে শুরু করলাম। এরপর আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেলাম। নতুন দেশেও সবকিছু নতুন উদ্যম শুরু হলো। কিন্তু আমি জানি না এই দেশের ভাগ্যে কী অদ্ভুত পরিহাস কাজ করে! কিছুদিন পরই রাজনৈতিক জীবনে অস্থিরতা শুরু হলো এবং রাজনীতি কলুষিত হতে থাকল। আগের দিনে যারা রাজনীতি করতেন, তারা নিজেদের জমিজমা বিক্রি করে রাজনীতি করতেন। আর স্বাধীনতার কিছুদিন পর থেকে রাজনীতি করে জমিদারি ও বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার প্রবণতা শুরু হলো। রাজনীতিতে এই কলুষতা আমাদের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
দীর্ঘ জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি কী?
পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ পাবেন না, যে বলবে আমার সবই প্রাপ্তি বা সবই অপ্রাপ্তি। শিল্পীদের মধ্যে সবসময় একটা অতৃপ্তি কাজ করে, আর এই অতৃপ্তিই একজন শিল্পীকে নতুন সৃষ্টির দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তবে সবকিছু বাদ দিয়ে আমি পরিষ্কারভাবে বলতে পারি, মানুষের যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পেয়েছি, এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমার আর কোনো অপ্রাপ্তি নেই। এই শত শত জনপ্রিয় গান, এগুলো আমার সন্তানের মতো। এগুলোকে আলাদা করার কিছু নেই। গানগুলো বেঁচে থাকবে, আমি একদিন থাকব না। কিন্তু আমার কর্ম মানুষের মাঝে বেঁচে থাকবে। একজন শিল্পীর জন্য এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দের। সারাটা জীবন আমি সততার সঙ্গে থাকতে চেষ্টা করেছি। বাকি জীবনটাও এভাবে কাটিয়ে দিতে চাই।
গান নিয়ে এই সময়ের তরুণদের আগ্রহ কতটা অনুভব করেন?
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সংগীত নিয়ে আগ্রহ প্রবল। তারা যথেষ্ট শ্রম দিচ্ছে, চেষ্টা করছে গান করার জন্য। এ ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই। তবে তাদের মনোযোগটা থাকে গানকে যেভাবেই হোক খাওয়াতে হবে। এই প্রবণতা থেকে তাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
বর্তমানে সিনেমার গানে কণ্ঠ দেওয়া নিয়ে সিন্ডিকেটের কথা শোনা যায়। আপনাদের সময়ে কি এই ব্যাপারগুলো ছিল?
আমাদের সময় এসব সিন্ডিকেট ছিল না। একটি গান তৈরি হওয়ার পর যদি মনে হতো এই গানটি অমুক শিল্পীর গলায় ভালো যাবে তবে তাকে দিয়েই গাওয়ানো হতো। প্রয়োজকের পছন্দের শিল্পী, নায়কের পছন্দের শিল্পী আমাদের সময় এসবের কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
আপনাদের সময়ের রেকর্ডিং আর এই সময়ের রেকর্ডিংয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পান?
পার্থক্য মানে, বিস্তর পার্থক্য (হেসে)। এখন তো মনে করেন স্টুডিওতে গেলাম ঘণ্টা খানেকের মধ্যে গান করে চলে আসলাম। আর আমাদের সময় একটা গান গেয়ে যতক্ষণ না নিজে তৃপ্তি পেতাম কিংবা মিউজিক ডিরেক্টরের চোখ ভিজে না যেত ততক্ষণ পর্যন্ত গাইতাম। এমনও হয়েছে এক গানের ফাইনান টেক নিতে ভোর হয়ে গেছে। এখনকার মতো গেলাম গাইলাম আর চলে আসলাম, এমনটা করার কোনো সুযোগই ছিল না। পাবলিককে খাওয়ানোর প্রবণতা ছিল না। ছিল আন্তরিকতা ও ভালোবাসা। এখন তো এই গল্প বললে কেউ বিশ্বাসই করবে না।
বর্তমানে এআই দিয়ে গান তৈরি হচ্ছে। এটাকে কীভাবে দেখছেন?
আমি মন্দভাবে দেখছি না। আপনাকে তো যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। যুগে যুগে পরিবর্তন এসেছে এবং মানুষ সেটা গ্রহণ করেছে। আর এআই দিয়ে যেসব গান হচ্ছে শুনে তো বোঝার উপায় নাই যে এটা ফেক। একটা ঘটনা শেয়ার করি। সেদিন আমি ইউটিউব স্ক্রল করার সময় একটি গান সামনে এলো। গানটি শুনে তো আমি অবাক। সঙ্গে সঙ্গে গানের লিংকটা রফিকুল আলমকে পাঠিয়ে বললাম, সারা জীবন কি কাজ করলাম এমন একটা গান গাইতে পারলাম না। এটা শুনে দেখ, কত আবেগ দিয়ে গানটা গেয়েছে। কিছুক্ষণ পর রফিক আমাকে ফোন করে বললেন, হাদী ভাই এটা তো এআই দিয়ে তৈরি। আপনি কোন জগতে বাস করছেন। আমি থ হয়ে গেলাম।
কেন গান থেকে অবসর নিয়েছেন?
পেশাগতভাবে আমি গান ছেড়ে দিয়েছি। করোনার পর শারীরিক কিছু সমস্যার কারণে আগের মতো আর গান করতে পারি না। তবে গান ছেড়ে দিয়ে একজন শিল্পী বেঁচে থাকতে পারে না। তাকে নিজের জন্য হলেও গান করতে হয়। আমিও করি। সারাদিনই আনমনে গুনগুন করি। গান পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ গান ছাড়া বেঁচে থাকাই কঠিন।
এই যে এত এত গান সংরক্ষণ করেছেন কী?
না, এগুলো সংরক্ষণের দায়িত্ব তো সরকারের। ব্যক্তিগতভাবে আমি না হয় আমার গানগুলো সংরক্ষণ করলাম, যদিও আমি করিনি। একটি জাতির শিল্প, সংস্কৃতি; ইতিহাস-ঐতিহ্য ধরে রাখার দায়িত্ব তো সরকারের। এ প্রসঙ্গে একটি কথা বলতে চাই, শিল্পকলার সংগীতশালা কিন্তু আমারই তৈরি করা প্রকল্প ছিল। বিভিন্ন দেশ ঘুরে তাদের সংস্কৃতি দেখে এই প্রকল্পটি করে ছিলাম। তাতে এই বিষয়টাও ছিল। কিন্তু অনাকাক্সিক্ষতভাবে গিয়ে দেখি ওইসব কিছুই করা হয়নি। এগুলো এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসার জায়গা। তবে আমি শুনেছি শিল্পকলা একাডেমি নতুন একটি ভবন নির্মাণ করছে, সেখানে হয়তো এই বিষয়গুলো থাকবে।

