দেশের নাট্যাঙ্গনের জনপ্রিয় অভিনেতা আ খ ম হাসান। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে টেলিভিশনে স্বকীয় অভিনয়শৈলী ও রসবোধের মাধ্যমে তিনি দর্শকদের হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন এবং জয় করেছেন কোটি মানুষের মন। চঞ্চল চৌধুরী ও মোশাররফ করিমের সমসাময়িক এই শক্তিশালী অভিনেতা বরাবরই চরিত্রে বৈচিত্র্য আনতে ভালোবাসেন। সম্প্রতি টেলিভিশনের চেনা গ-ি পেরিয়ে তিনি পা রেখেছেন ওটিটি প্ল্যাটফর্মের নতুন ও সম্ভাবনাময় দুনিয়ায়। ওটিটিতে তার এই নতুন যাত্রা, কাজের অভিজ্ঞতা, নাট্যজগতের বিবর্তন, সহশিল্পীদের নিয়ে সমসাময়িক নানা আলোচনা এবং তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রকিবুল ইসলাম আফ্রিদি
কেমন আছেন?
আলহামদুলিল্লাহ, অনেক ভালো আছি। বর্তমানে ধারাবাহিক নাটকের কাজ নিয়ে ব্যস্ততা যাচ্ছে। কয়েকটি ধারাবাহিক বিভিন্ন টেলিভিশনে নিয়মিত প্রচার হচ্ছে। কাজ নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করছি।
প্রথমবার ওটিটিতে কাজ করেছেন। ওটিটির কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে?
টেলিভিশন বা ধারাবাহিক নাটকের তুলনায় ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কাজের বাজেট সাধারণত বেশ ভালো থাকে। বাজেট ভালো হওয়ার কারণে ক্যামেরার কাজ, লোকেশন নির্বাচনসহ সবক্ষেত্রেই একটা উচ্চ গুণগত মান বজায় রাখা সম্ভব হয়। গল্পের চাহিদা অনুযায়ী সঠিক লোকেশনে দৃশ্যধারণ করা যায় বলেই ওটিটির কাজগুলো এতটা চমৎকার হয় এবং দর্শকরাও দেখে বেশ তৃপ্তি পান। এর মেকিং বা গুণগত মান অন্য যেকোনো মাধ্যমের চেয়ে আলাদা হওয়ায় ওটিটির কাজে আসলে একটা চলচ্চিত্রের (ফিল্মের) আবহ বা ইমেজ পাওয়া যায়। দৈর্ঘ্য একটু ছোট হলেও মেকিং ও কাজের ধরনের দিক থেকে একে ওটিটি ফিল্মই বলা চলে। টেলিভিশন সিরিয়াল, এক ঘণ্টার নাটক কিংবা ইউটিউবের কাজে বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে এই সিনেমাটিক ফ্লেভারটা ওভাবে পাওয়া যায় না। একজন অভিনেতা হিসেবে সবসময়ই চাই আমার চরিত্রটি যেন নিখুঁতভাবে ফুটে ওঠে। ওটিটিতে যখন পুরো মনোযোগ দিয়ে, সুন্দর পিকচারাইজেশনের মাধ্যমে কাজ করার সুযোগ পাই, তখন একজন শিল্পী হিসেবে নিজের সেরাটা দেওয়া সম্ভব হয়। আর কাজটা যখন নিখুঁতভাবে করা যায়, তখন অভিনেতা হিসেবে নিজের ভেতরও একটা দারুণ আত্মতৃপ্তি কাজ করে, যা অত্যন্ত স্বাভাবিক।
দর্শক আপনাকে নতুন রূপে, নতুন মাধ্যমে দেখবে। অনুভূতি এবং কাজটি নিয়ে কেমন আশাবাদী?
একজন অভিনেতা হিসেবে অনুভূতিটা সত্যিই দারুণ। একজন শিল্পী তো সবসময়ই চায় যত বেশি সম্ভব বৈচিত্র্যময় চরিত্রে কাজ করতে। টেলিভিশন বা ইউটিউবে আমাকে মূলত হাস্যরসাত্মক চরিত্রগুলোতেই বেশি দেখা গেছে। দর্শক এগুলো পছন্দ করত, ভিউর একটা ব্যাপার থাকত; আর তাই অনেক সময় আমিও এ ধরনের কাজ করতে একরকম বাধ্য হয়েছি। কিন্তু ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ব্যাপারটা আলাদা। সেখানেও ভিউ বা দর্শকপ্রিয়তার গুরুত্ব আছে, তবে চরিত্রের ধরনে অনেক বৈচিত্র্য থাকেÑ সেটা যেমন হাসির হতে পারে, তেমনই হতে পারে ভীষণ গম্ভীর বা সিরিয়াস। ওটিটিতে বর্তমানে আমি যে দুটি কাজ করেছি, তার চরিত্রগুলো বেশ সিরিয়াস ঘরানার। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের কাজ করার যে একঘেয়েমি তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বের হতে পেরেছি এবং এটা আমার খুব ভালো লাগছে। একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে আমি সবসময়ই ভিন্ন ভিন্ন প্যাটার্নের চরিত্র নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চাই, সেই জায়গা থেকে ওটিটি আমার ক্যারিয়ারের জন্য একটি বড় প্লাস পয়েন্ট।
‘লাইফলাইন’ নিয়ে জানতে চাই
কাজী আসাদ পরিচালিত এই ওয়েব ফিল্মটি ২২ জুন চরকিতে মুক্তি পাবে। এখানে দর্শক আমাকে ভিন্নভাবে দেখতে পাবেন। ভালো লাগার বিষয় হলো, নির্মাতা বলেছেন, তিনি আমাকে চিন্তা করেই চরিত্রটা লিখেছেন। একজন অভিনেতার জন্য এটা অনেক বড় পাওয়া। ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়া ওয়াহিদ আনাম পরিচালিত ওয়েব ফিল্ম ‘তাজমহল’-এ ‘ভুনা ভাই’ চরিত্রে অভিনয় করে বেশ প্রশংসা পাচ্ছি। এত এত ফোন আগে কোনো কাজে পাইনি। ফেসবুকেও অনেকেই লিখেছেন। মনে হচ্ছে যেন দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করেছি। আমার দর্শক তো ইউটিউব আর টেলিভিশনে, সেখানে ওটিটির দর্শকের এ ভালোবাসায় প্রমাণ হয় আমি হয়তো ভালো অভিনয় করেছি।
বর্তমানে অনেক সিনিয়র শিল্পী ওটিটিতে নিয়মিত হচ্ছেন। আপনি কি মনে করেন, ভবিষ্যতে টেলিভিশনের চেয়ে ওটিটির গুরুত্ব আরও বাড়বে?
টেলিভিশনে নাটক তো মানুষ একদম বিনামূল্যে দেখতে পায়, কিন্তু ওটিটির কনটেন্ট দেখতে হলে টাকা খরচ করে সাবস্ক্রিপশন নিতে হয়। সেই জায়গা থেকে বলব, দর্শকদের রুচির যদি পরিবর্তন বা উন্নতি ঘটেÑ তারা যদি মনে করেন যে আরও ভালো মানের, আরও সুন্দর গল্প এবং চমৎকার পিকচারাইজেশনের কাজ দেখবেন, তবে মানুষ আস্তে আস্তে ওটিটির দিকেই ঝুঁকবে। যেহেতু এটি তুলনামূলক নতুন একটি মাধ্যম, আমার বিশ্বাস সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একসময় সবাই ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা শুরু করবে।
ওটিটিতে কি এমন কোনো চরিত্র করতে চান, যা টেলিভিশনে করা সম্ভব হয়নি?
না, ওটিটিতে করার মতো আমার আলাদা কোনো স্বপ্নের চরিত্র নেই। আমি যেকোনো ধরনের চরিত্রেই কাজ করতে প্রস্তুত এবং প্রতিটি চরিত্রকেই পর্দায় সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করি। আসলে চরিত্রের সৃষ্টি তো মানুষের বাস্তব জীবন থেকেই, তাই না? মানুষ হাসে, কাঁদে, রাগ করে, হিংসা করে কিংবা ভালোবাসেÑ আমাদের নাটক বা সিনেমায় তো মানুষের এই অনুভূতিগুলোরই প্রতিফলন ঘটে। তাই আমার ইচ্ছা সব ধরনের চরিত্র নিয়েই কাজ করার। যে চরিত্রেই অভিনয় করার সুযোগ পাব, তাতেই নিজের সেরাটা দেব। নির্দিষ্ট কোনো স্বপ্নের চরিত্র আমার নেই, আর ওভাবে কখনো ভাবিও না।
একসময় পরিবারের সবাই মিলে টিভি নাটক দেখত। এখন দর্শক মোবাইল ফোনে একা একা কনটেন্ট দেখছে। এই পরিবর্তনকে কীভাবে দেখেন?
আসলে এটা যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই হয়ে গেছে, এখানে কিছুই করার নেই। আর এই পরিবর্তনের মূল কারণ হলো প্রযুক্তি। আগে মানুষের হাতে হাতে মোবাইল বা এই আধুনিক প্রযুক্তি ছিল না, যার কারণে সবাই পরিবার-পরিজন নিয়ে একসঙ্গে বসে টেলিভিশন দেখত। তখন বিনোদনের একমাত্র মাধ্যমই ছিল টেলিভিশন। এখন প্রযুক্তি অনেক উন্নত হয়েছে। সবার হাতে হাতে এখন স্মার্টফোন, যার ফলে মানুষ নিজের সুবিধা মতো যেকোনো সময় যেকোনো কনটেন্ট দেখে নিতে পারছে। আগে টেলিভিশনে তো আর যখন-তখন দেখার সুযোগ ছিল না। এই প্রযুক্তির কারণেই আমার মনে হয় এখন টেলিভিশনের চেয়েও অনেক বেশি মানুষের কাছে নাটক, সিনেমা বা যেকোনো ধরনের সাংস্কৃতিক কনটেন্ট পৌঁছে যাচ্ছে এবং মানুষ তা দেখছে। আমার কাছে বিষয়টি একটি ভালো দিক বলেই মনে হয়।
জনপ্রিয়তা ধরে রাখার চেয়ে অভিনয়শিল্পী হিসেবে টিকে থাকা কি বেশি কঠিন?
একজন অভিনয়শিল্পী তখনই টিকে থাকবেন, যখন দর্শকরা তাকে আপন করে নেবেন বা গ্রহণ করবেন। আর দর্শক যখন কাউকে মন থেকে গ্রহণ করেন, তখনই তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। পক্ষান্তরে, দর্শক যদি গ্রহণ না করেন, তবে সেই শিল্পীর পক্ষে টিকে থাকা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
আমাদের এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ওটিটিতে সিন্ডিকেটে ভরা’, ‘অভিনয় গুণের চেয়ে রাজনীতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়’ এবং এ কারণেই ওটিটিতে যুক্ত হননি। এখন ওটিটিতে কাজ করেছেন। জানতে চাই, আপনার সেই মূল্যায়ন কি বদলেছে, নাকি ওটিটির পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে?
না, আমি এটাকে রাজনীতি বলব না। আমার কাছে মনে হয়েছে, একই মানুষ বা একই শিল্পী বারবার একই জায়গায় কাজ করছেন, অন্য কেউ চাইলেই সেখানে কাজ করতে পারছেন না বা তাদের নেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু এখন আমার মনে হয়, নির্মাতা, প্রযোজক বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মÑ এগুলো দিনশেষে একেকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। সংস্কৃতি বা সিনেমা যতই সৃজনশীল মাধ্যম হোক না কেন, এর পেছনে একটা বড় ব্যবসা জড়িয়ে আছে। তাই তারা যখন মনে করবে যেকোনো একটি নির্দিষ্ট চরিত্রের জন্য অমুক অভিনেতাকে দরকার, কিংবা কোনো অভিনেতাকে দিয়ে তাদের প্ল্যাটফর্মের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য সফল হবে, তখন তারা তাকেই নেবে। এখন যেহেতু আমাকে ডাকা হচ্ছে, তার মানে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো হয়তো আমার ব্যাপারেও সে রকম কোনো চিন্তাভাবনা করছে। আর গ্রুপিংয়ের যে বিষয়টা, হ্যাঁ, গ্রুপিং কিছুটা আছে। আমার জানামতে, আমার অনেক বন্ধু-বান্ধবী ওটিটিতে কাজ করার আপ্রাণ চেষ্টা করেও সুযোগ পায়নি। এমন সিচুয়েশনের কথাও আমি শুনেছি যেখানে হয়তো কারো ব্যাপারে নেতিবাচক কথা ছড়ানো হয়। ধরুন, ১০ জনের মধ্যে সাতজনই বলল যে ‘তাকে নিয়ে কাজ করা ঠিক হবে না’, আর বাকি তিনজন বলল ‘না, তাকে নেওয়া হোক’Ñ যেহেতু সাতজনই বিপক্ষে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই শিল্পী কাজটা আর পায় না। এ ধরনের গ্রুপিং বা লবিংয়ের কথা আমি অনেকের কাছেই শুনেছি।
নাটকের স্বর্ণালি সময়ে আপনি, মোশাররফ করিম ও চঞ্চল চৌধুরী একই প্রজন্মের জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন। পরবর্তীতে মোশাররফ করিম ও চঞ্চল চৌধুরী ওটিটিতেও নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। এবার আপনিও ওটিটিতে কাজ করছেন। এ মাধ্যমেও কি তেমন প্রভাবশালী উপস্থিতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা আছে?
ওটিটিতে বেশি বেশি কাজ করাটা আসলে চাইলেই শুধু আমার একার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বা পরিচালকরা যদি মনে করেন যে কোনো চরিত্রের জন্য আমাকে প্রয়োজন বা আমাকে দিয়ে বেশি কাজ করানো উচিত, তবেই তা করতে পারব। যেহেতু অভিনয়ই আমার পেশা, তাই মাধ্যমটি ওটিটি, টেলিভিশন সিরিয়াল নাকি সিনেমাÑ তা আমার কাছে মুখ্য নয়। যখনই দেখব চরিত্রটি ভালো এবং আমার করা উচিত, আমি যেকোনো মাধ্যমেই কাজ করতে প্রস্তুত। তবে হ্যাঁ, এখন থেকে অবশ্যই ভালো গল্প দেখে কাজ করব। আগে হয়তো ভিউ বা দর্শক চাহিদার কারণে একই ধরনের কাজ আমাকে দুই-তিন বা চারবারও করতে হয়েছে, কিন্তু এখন আর তা করব না। এখন থেকে খুব বেছে বেছে মানসম্মত কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
মোশাররফ করিম আপনার দীর্ঘদিনের সহকর্মী। সম্প্রতি ভারতে তার সঙ্গে একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে। একজন সহশিল্পী হিসেবে বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
বিষয়টি আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি। আসলে সেখানে তেমন বড় কিছুই ঘটেনি, বিষয়টিকে অনেক বেশি অতিরঞ্জিত বা বাড়িয়ে বলা হয়েছে। খুবই সাধারণ একটি বিষয় নিয়ে আসলে বেশি কিছু বলতে চাই না। বাস্তব জীবনে আমার মত বা দর্শনের বিপক্ষে মানুষ থাকতেই পারে এবং তারা বিভিন্ন সময় কটু কথা বলতেই পারেÑ এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে পুরো বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করে এবং বাড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে, যা মোটেও ঠিক হয়নি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন