ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই, ২০২৬

ভিউ নয়, মানসম্মত কাজই শিল্পীর পরিচয়

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ৪, ২০২৬, ০৫:৪১ এএম

 

ছোট পর্দার এ সময়ের অন্যতম দর্শকপ্রিয় অভিনেত্রী পারসা ইভানা। দীর্ঘ ১১ বছরের অভিনয় জীবনে নিজের মেধা, অনবদ্য অভিনয়শৈলী আর অসাধারণ নৃত্যদক্ষতা দিয়ে দর্শকদের হৃদয়ে এক আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ব্যাচেলর পয়েন্টে ইভা চরিত্রটি দিয়ে জয় করেছেন কোটি ভক্তের মন। সম্প্রতি পর্দায় ভিন্নধর্মী চরিত্রে নিজেকে ভেঙে এক নতুন ইভানার পরিচয় দিয়েছেন এই অন্তর্মুখী ও প্রতিভাবান শিল্পী। দলবাজি বা সিন্ডিকেটের পেছনে না ছুটে যিনি বিশ্বাস করেন কেবল নিজের মেধা, পরিশ্রম আর সততায়। বর্তমান ব্যস্ততা, ওটিটির জোয়ার, ভিউ কালচার এবং নিজের ক্যারিয়ারের নানান দিক নিয়ে রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রকিবুল ইসলাম আফ্রিদি

সাম্প্রতিক সময়ে আপনার অভিনীত বেশ কিছু নাটক ও ওয়েব কনটেন্ট দর্শকদের মাঝে দারুণ সাড়া ফেলেছে। এই মুহূর্তে ব্যস্ততা কি নিয়ে এবং বর্তমান কাজগুলো আগের চেয়ে কতটা আলাদা?

বর্তমানে নতুন একটি নাটকের কাজে ব্যস্ত আছি। এর আগে আমার করা ‘মিস্টার বাদল’ নামের কাজটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং দর্শকরা সেটি পছন্দ করেছিলেন। নতুন নাটকটি সেই একই পরিচালকের সঙ্গে আমার দ্বিতীয় কাজ। এই ভিন্নধর্মী গল্পটি নিয়ে আমি অত্যন্ত আশাবাদী। আজকাল একক নাটকের পাশাপাশি ওটিটি মাধ্যমের দিকে একটু বেশি মনোযোগ দিচ্ছি। চেষ্টা করছি প্রতিটি কাজের গল্প ও চরিত্র যেন একটি অন্যটির চেয়ে আলাদা হয়। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে কম বয়সের কারণে অনেক কিছু না বুঝেই, চিত্রনাট্য না পড়ে কিংবা যাচাই-বাছাই না করে পরিচালকদের শিডিউল দিয়ে দিতাম। কিন্তু এখন যেকোনো চরিত্র নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করার চেষ্টা করি। এখন মানসম্মত কাজ করার জন্য উপযুক্ত বাজেট এবং ভালো পরিচালকদের প্রাধান্য দিচ্ছি। কারণ অভিনয় শুধু একার বিষয় নয়, একটি ভালো কাজের পেছনে পরিচালকের দূরদর্শিতা, বাজেট, গল্পভাবনা, আবহসংগীত এবং সহশিল্পীদের অবদানসহ পুরো একটি দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা জড়িয়ে থাকে। তাই সবকিছু বিবেচনা করে এবং অনেক বুঝেশুনেই এখন কাজগুলো করার চেষ্টা করছি।

‘লাইটার’ শিরোনামের নাটকে আপনাকে একদম ভিন্ন রূপে দেখা গেছে। চরিত্রটি ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

কাজের অভিজ্ঞতাটি দারুণ ছিল, তবে বেশ ধকল গিয়েছে। যেহেতু গল্পটি বর্তমান ও অতীতÍএই দুটি ভিন্ন সময়ের পটভূমিতে তৈরি, তাই ফুটিয়ে তুলতে আমার বেশ কষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে এই তীব্র গরমের মধ্যে এসিডদগ্ধ মুখের যে রূপসজ্জা করা হয়েছিল, তা ছিল মোম ও আঠা দিয়ে তৈরি। পুরো কাজটি করতে গিয়ে আমাকে প্রায় ১১ বারের মতো এই আঠালো রূপসজ্জা নিতে হয়েছে। বারবার এই বিশেষ রূপসজ্জা করা, তারপর তা তুলে আবার নতুন রূপসজ্জা নেওয়াটা ছিল ভীষণ কষ্টসাধ্য। এর পাশাপাশি অভিনয়টাও ঠিকঠাক ফুটিয়ে তুলতে হয়েছে। শুটিং শেষ হওয়ার পরের দিন আমার মুখের যে পাশে এসিডে পোড়া অংশটি করা হয়েছিল, সেই পাশের চামড়া ছিলে যায়। কারণ রূপসজ্জাটি করার চেয়ে তোলা আরও বেশি যন্ত্রণাদায়ক ছিল। তোলার সময় চামড়াসহ টেনে ধরে উঠে আসত। সেই ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি, এখনো ঠিক করতে হচ্ছে। আসলে যেকোনো চ্যালেঞ্জিং চরিত্রের ক্ষেত্রে মানসিক প্রস্তুতির পাশাপাশি বড় ধরনের শারীরিক চ্যালেঞ্জও থাকে। অভিনয় কিভাবে করব সেই ভাবনার পাশাপাশি এমন অনেক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে অভিজ্ঞতাটি চমৎকার। আমি ভীষণ আনন্দিত যে দর্শকরা আমাকে এই চরিত্রে এভাবে গ্রহণ করেছেন এবং পছন্দ করেছেন। আমি আমার নির্মাতার কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ যে তিনি আমাকে এত কঠিন একটি চরিত্র করার যোগ্য মনে করেছেন। সাধারণত এই ধরনের চরিত্র সবার ভাগ্যে জোটে না। সেই জায়গা থেকে নিজেকে অনেক ভাগ্যবান ও আশীর্বাদপুষ্ট মনে করি। কষ্ট তো সাময়িক, কিন্তু যখন কাজের ফলাফল এমন দারুণ হয়, তখন আমরা সব কষ্টই ভুলে যাই।

ব্যাচেলর পয়েন্ট সিজন ৫ শেষের দিকে। এই সিজনে আপনার দেখা মিলবে নাকি ভবিষ্যতে কোনো এক সিজনে দেখা যাবে?

এই বিষয়ে এখনো কিছু জানি না। অমি ভাইকে কখনো জিজ্ঞেসও করিনি যে সামনে আমার কোনো উপস্থিতি থাকবে কিনা। অমি ভাই যদি মনে করেন আমাকে আবারও ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’-এ প্রয়োজন, তাহলে অবশ্যই আমি কাজ করব। পুরো বিষয়টি সম্পূর্ণ তার ওপর নির্ভর করছে। তবে দর্শকরা যে আমাকে অনেক মনে করেন, সেটা আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে লক্ষ্য করি। অনেকেই আমাকে ট্যাগ বা উল্লেখ করে বলেন, ‘ইভাকে আবারও চাই, রোকেয়াকে লাগবে না।’ এই ধরনের অনেক মন্তব্য আমার চোখে পড়ে। নাটকে আমার ‘ইভা’ চরিত্রটি খুব অল্প সময়ের জন্য ছিল। কিন্তু এত অল্প সময়ে দর্শকরা আমাকে যে পরিমাণ ভালোবাসা দিয়েছেন, ভাগ্য সহায় না থাকলে তা কখনোই সম্ভব হতো না। এই নাটকে অনেক চরিত্র এসেছে এবং চলেও গেছে, দর্শকরা কিন্তু সবার কথা মনে রাখেননি। সেখানে আমার চরিত্রটিকে তারা এভাবে মনে রেখেছেনÍএটি আমার কাছে এক অন্যরকম অনুভূতি, যা আমি সারা জীবন হৃদয়ে লালন করব। তাই অমি ভাই যখনই আমাকে ‘ইভা’ চরিত্রের জন্য ডাকবেন, তা যদি মাত্র একটি দৃশ্যের জন্যও হয়, আমি লুফে নেব।

দর্শক ব্যাচেলর পয়েন্টে আপনাকে খুব মিস করছেন। আপনি মিস করেন?

ভীষণ মনে পড়ে দিনগুলোর কথা। জীবনে খুব বেশি ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করিনি। আর কোনো ধারাবাহিকে ওভাবে আমার চরিত্র ফুটে ওঠেনি বা দর্শকরাও নাম মনে রাখেননি। কিন্তু এই নাটকের পর রাস্তাঘাটে, গাড়িতে, বাসে, ট্রেনে, এমনকি দেশের বাইরেÍযেখানেই যাই না কেন, সবাই জিজ্ঞেস করেন, ‘ইভা আপু, ইভা আপু কবে আসবেন?’ ‘ইভা’ চরিত্রটি আমি খুব মন থেকে করেছিলাম। এর আগে আমাকে কেউ কখনো নৃত্যশিল্পী বা নাচের শিক্ষকের চরিত্রে কাজ করার সুযোগ দেননি। অনেকে তো জানতেনই না যে আমি নাচ পারি। সেই জায়গা থেকে অমি ভাই আমাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন, নাটকে আমার নাচের অনেক দৃশ্যও ছিল। আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে দীর্ঘ দেড় বছর শুধু ব্যাচেলর পয়েন্টের চিত্রধারণের কাজ করেছি, তখন অন্য কোনো কাজই করিনি। সেই জায়গা থেকে নাটকটিকে মনে না করার কোনো কারণই নেই। আমি এর প্রতিটি মুহূর্ত ভীষণভাবে মনে করি। এখনো এই নাটকের কোনো ছোট অংশ বা ভিডিও ক্লিপ সামনে আসলে অতীতে হারিয়ে যাই। মনের অজান্তেই চোখের কোণে পানি চলে আসে। ভাবি, আহা! কী চমৎকার দিনই না ছিল সেগুলো।

সিনেমায় কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন, ভালো গল্প বা আপনার মনের মত কাজের প্রস্তাব এখনো পেয়েছেন?

আমি চলচ্চিত্রের অনেক প্রস্তাব পেয়েছি, এমনকি গত কয়েকদিন আগেও পেয়েছি। কিন্তু এখনো আমার মনের মতো কোনো গল্প পাইনি, যা আমি পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করতে পারি। আমি আগেও বলেছি, একটি চলচ্চিত্রে কাজ করতে গেলে পরিচালক, সহশিল্পী, গান, চিত্রধারণের স্থান এবং প্রযোজনা সংস্থাসহ সবকিছুই অনেক গুরুত্ব বহন করে। যেদিন আমার মনে হবে যে, আমি একজন যোগ্য পরিচালকের ডাক পেয়েছি এবং এমন একটি চরিত্র পেয়েছি যেখানে একজন অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রমাণের সুযোগ আছে, সেদিনই চলচ্চিত্রে পা রাখব। মাত্র এক-দুটি দৃশ্যের জন্য বড় পর্দায় কাজ করতে চাই না। সত্যি বলতে, মারামারি, হাউমাউ আর নাচ-গানের অতি বাণিজ্যিক ঘরানার চলচ্চিত্রে কাজ করার ইচ্ছে আমার নেই। আমি এমন একটি চরিত্রে অভিনয় করতে চাই, যা দেখার পর দর্শকদের মনে হবেÍবাহ! এ তো এক অন্যরকম ইভানা, ওকে তো চেনাই যাচ্ছে না। আমি মূলত সেই দিনটির জন্যই অপেক্ষা করছি। আর সহশিল্পী হিসেবে শাকিব খান, আরিফিন শুভ কিংবা সিয়াম আহমেদÍযারা এখন চমৎকার কাজ করছেন, তাদের যেকোনো কারোর সঙ্গেই কাজ করতে আমার কোনো আপত্তি নেই। মূল কথা হলো, গল্প ও চরিত্রটি মানসম্মত হতে হবে।

জিয়াউল হক পলাশের সঙ্গে আপনার জুটি ইতিমধ্যেই দর্শকের মধ্যে ভালো সাড়া ফেলেছে। ভবিষ্যতে এই জুটিকে আরও বড় কোনো প্রজেক্ট বা নতুন ধরনের চমক দেওয়ার পরিকল্পনা আছে?

আমি আর পলাশ আসলে সবসময় একটু বুঝেশুনে কাজ করার চেষ্টা করি। জুটি হিসেবে আমাদের কাছে একসঙ্গে কাজ করার প্রচুর প্রস্তাব আসে, কিন্তু আমরা সব কাজে রাজি হই না। আমার মনে হয়, দর্শকরা আমাদের দুজনকে এত বেশি পছন্দ করেন এবং যেভাবে ইতিবাচক সাড়া দেনÍসেটার মান ধরে রাখা আমাদের দুজনেরই এক বড় দায়িত্ব। সেই জায়গা থেকেই আমরা বাছবিচার করে কাজ করি। আমাদের লক্ষ্য থাকে, আমরা হয়তো হঠাৎ করে একটা কাজ করব, কিন্তু সেটি যেন মানসম্মত হয়। কাজটি অনেক বেশি মানুষ না দেখলেও যারা দেখবেন, তারা যেন মন থেকে বলেন যে ওরা একটা সুন্দর কাজ করেছে। যেমন আমাদের ‘লাইটার’ নাটকটি কোটি ভিউ হয়তো হয়নি, কিন্তু যে ত্রিশ লক্ষ মানুষ এটি দেখেছেন, তাদের প্রত্যেকেই কাজটি পছন্দ করেছেন ও প্রশংসা করেছেন। এই বিষয়টি আমার আর পলাশের মাথায় সবসময় থাকে। সামনেও আমরা এই ভাবনা থেকেই একটি নতুন কাজ করব, আশা করি সেটিও দর্শকদের ভালো লাগবে। আসলে খুব বড় ধরনের কোনো গোছানো পরিকল্পনা ও ভালো কাজের সুযোগ ছাড়া আমরা একসঙ্গে কোনো কাজে হাত দিই না।

ভ্যানিশিং ম্যান নাটক কি আপনার করার কথা ছিল?

হ্যাঁ, ‘ভ্যানিশিং ম্যান’ নাটকের প্রথমটি আমারই করার কথা ছিল। তবে সেখানে আমার চরিত্রটির উপস্থিতি ছিল মাত্র দুই থেকে তিনটি দৃশ্যের। আমার মনে হয়েছিল, পর্দায় এত কম সময়ের উপস্থিতি, তাও আবার অমি ভাই ছাড়া অন্য একজন পরিচালকÍতিনি আমাকে কতটুকুই বা সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন! এই বিষয়টি নিয়ে আমি কিছুটা দ্বিধা দ্বন্দ্বে ছিলাম। মূলত সেই দোটানা থেকেই প্রথম পর্বে আমার আর কাজ করা হয়ে ওঠেনি। আর সেই কারণেই হয়তো নাটকের দ্বিতীয় পর্বে আমাকে আর ডাকা হয়নি।

নাটক ও ওটিটির সিন্ডিকেট নিয়ে কি বলবেন?

আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো দলবাজি বা সিন্ডিকেটে বিশ্বাস করি না। তারপরও আজকাল লক্ষ্য করি, নাট্যাঙ্গন ও ওটিটিÍ উভয় মাধ্যমেই আলাদা আলাদা দল তৈরি হয়ে গেছে। আমার এই ১১ বছরের অভিনয় জীবনে কোনোদিন কারো সঙ্গে দল পাকিয়ে কাজ করতে পারিনি। আসলে কাজের বাইরে গিয়ে বাড়তি যে আড্ডা দেওয়া, তা কেন যেন আমার হয়ে ওঠে না। পলাশ আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু, অথচ শুটিংয়ের বাইরে ওর সঙ্গেও আমার আড্ডা হয় না বললেই চলে, কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠান থাকলে কেবল তখনই দেখা হয়। আমি ছোটবেলা থেকেই খুব একটা আড্ডাবাজ নই, বেশ অন্তর্মুখী স্বভাবের। সেই জায়গা থেকে অন্য অনেক শিল্পীর মতো আমি চতুরতার সঙ্গে হিসাব কষে চিন্তা করতে পারি না যেÍকারো সঙ্গে বেশি আড্ডা দিলে তাদের দলে ঢুকে যেতে পারব। একে যদি আমার ব্যর্থতা বলেন, তবে তাই, হয়তো এই কারণে আমি কিছুটা পিছিয়েও আছি। তবে আমি বিশ্বাস করি, আমার যদি মেধা থাকে, তবে কারো সঙ্গে আড্ডায় বসে কাজ জোগাড় করতে হবে না, মেধার জোরেই কাজ পাব। আমি আমার অবসর সময়ে বাসায় থেকে বিভিন্ন দেশের সিরিজ বা চলচ্চিত্র দেখি, কোন উৎসবগুলোতে কি ধরনের কাজ হচ্ছে সেগুলোর খোঁজ রাখি। এছাড়া বই পড়ি, জিমে যাই এবং নিজের রূপ ও স্বাস্থ্যের যতœ নিই। আমি যতদিন নিজেকে অভিনয়ে যোগ্য ও প্রস্তুত রাখব, ততদিন আমাকে কাজ থেকে কেউ খুব বেশি দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে না। তবে এটিও সত্যি যে, অনেকেই আমাকে কাজে নেন না। অনেকে তাদের সিন্ডিকেটের পছন্দের শিল্পীদের দিয়েই বারবার কাজ করান, তা চরিত্রটির সঙ্গে মিলুক আর নাই মিলুক। আমার এ নিয়ে কোনো আফসোস নেই, কারণ জীবিকার মালিক আল্লাহ। আমি জানি, আমার ভাগ্যে যা আছে তা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। আমার পুরো মনোযোগ থাকে নিজের দক্ষতার কতটুকু উন্নতি করা যায়, সেই দিকে। এই কারণেই কিন্তু আমি আমেরিকায় গিয়ে অভিনয়ের ওপর একটি প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। আমি চাইলে সেখানে ঘুরে-বেড়িয়ে বা আমোদ-প্রমোদ করে সময় কাটাতে পারতাম, কিন্তু আমি সেই মানসিকতার নই। আমি নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করতে চাই। তাই অন্য কেউ আমাকে কাজে নিল কি নিল নাÍতাতে আমার নিজের কোনো কিছু আসে-যায় না।

এখনকার গল্পের মান বাড়ছে, নাকি শুধু ট্রেন্ড ফলো করা হচ্ছে বলে মনে হয়?

আমার মনে হয় দুটোই ঘটছে। একটা সার্কেল আছে যারা শুধু হাউমাউ-কাউ ট্রেন্ড ফলো করছে, যেগুলোর গল্পের কোনো আগামাথা নেই, তাও তারা অনবরত করে যাচ্ছে। আবার অন্যদিকে এমন কিছু পরিচালকও আছেন, যারা কেবল গল্পের মানের ওপরই জোর দিচ্ছেন। এখন দর্শকেরা কোন ধরনের কাজ গ্রহণ করবেন, সেটি সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব ব্যাপার। আমাদের এই বিনোদন মাধ্যমে অনেক সময় অত্যন্ত নি¤œমানের নাটকেও প্রচুর দর্শকপ্রিয়তা বা ভিউ দেখা যায়, আবার অনেক ভালো নাটকেও ভালো ভিউ আসে। একইভাবে, অনেক দারুণ নাটক হয়তো দর্শক পাচ্ছ না, অথচ একদমই মানহীন কিছু নাটক দর্শক সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষে চলে যাচ্ছে। এই পুরো বিষয়টি আসলে পুরোপুরি নির্ভর করে দর্শকদের রুচির ওপর।

ভবিষ্যতে আপনি কোন ধরনের চরিত্রে নিজেকে ভাঙতে চান?

আমি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চরিত্রে অভিনয় করতে চাই। ভবিষ্যতের কথা ওভাবে নির্দিষ্ট করে বলতে পারি না, তবে এখন আমার কাছে যে চরিত্রগুলোই আসে, সেগুলোতে চেষ্টা করি আগের অভিনয়ের পুনরাবৃত্তি না করে কিছুটা ভিন্নধর্মী কি করা যায়। আমি মূলত বাস্তবসম্মত গল্পে কাজ করতে বেশি পছন্দ করি, যেগুলো মানুষের জীবনের সঙ্গে অনেক বেশি মিলে যায়। বাস্তবের চেয়ে অনেক বড় বা অতিরঞ্জিত কোনো চরিত্র, কিংবা একেবারেই অদ্ভুত ও কাল্পনিক ধরনের চরিত্র আমার ভালো লাগে না। আমি খুব স্বাভাবিক ও বাস্তবধর্মী গল্পে কাজ করতে চাই। এমন সব চরিত্র খুঁজছি যেখানে অভিনয়ে নিজেকে যেন চেনা না যায়। আমি চাই দর্শকরা যেন আমাকে পারসা ইভানা নামে না চিনে, বরং পর্দার সেই চরিত্রের নামে চিনে ডাকতে পারেন।

অভিনয় নিয়ে আপনি বেশ পড়াশোনা করেছেন, সেই সঙ্গে নৃত্যকেও প্রাধান্য দিয়েছেন। এতে বোঝা যায় আপনার স্বপ্ন বেশ বড় এবং নিজের আরো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে চান। এই স্বপ্ন সম্পর্কে জানতে চাই। ভবিষ্যতে নিজেকে কোথায় দেখতে চান?

আমি খুব বেশি দূরের চিন্তা করতে পারি না। আমার সবসময় মনে হয় জীবনটা ভীষণ অনিশ্চিত এবং অনেক ছোট। তাই আমি আজ বেঁচে আছি এবং আজ কি করছিÍসেটিই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে। পাঁচ বছর পর কি করব, তা আমি আসলে আগে থেকে ভাবতে পারি না, কারণ আমার আজকের দিনটিই যদি ঠিক না থাকে, তবে পাঁচ বছর পর কিছুই করতে পারব না। তাই বর্তমানে আমি কি করছি, সেটিই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সুস্থতা আল্লাহর অনেক বড় একটি নিয়ামত, কখন কি হয়ে যায় তা কেউ বলতে পারে না। আমি যদি সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকি, তবে সারাজীবন নাচটা করে যেতে চাই। আর নাচের পাশাপাশি অভিনয়টাও চালিয়ে যেতে চাই, কোনোটিই ছাড়তে চাই না। প্রতিবার যখন আমি কোনো নৃত্য পরিবেশন করি কিংবা কোনো চরিত্রে অভিনয় করি, তখন আমার আগের কাজের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুনভাবে নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা করি। আমি প্রতিনিয়ত নতুন এক নিজেকে দেখতে চাই। তাই পাঁচ বছর পরের অবাস্তব কোনো লক্ষ্য না এঁকে বর্তমানের কাজেই মগ্ন থাকতে চাই।

বর্তমান সময়ে নাটকের ভিউ বা ট্রেন্ড দিয়ে অনেক সময় কাজের মূল্যায়ন করা হয়। একজন শিল্পী হিসেবে এই ভিউ কালচার কিভাবে দেখেন?

ভিউ কালচার আগেও ছিল। তখন হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এমন জোয়ার ছিল না বলে মনে হচ্ছে এটি একদম নতুন কিছু। কিন্তু অতীতে টিআরপি নামের একটি বিষয় সবসময়ই ছিল, যা আমরা কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারব না। আমাদের অগ্রজ বা জ্যেষ্ঠ শিল্পীরা যখন টেলিভিশনে নাটক করতেন, আমি তাদের কাছেই শুনেছিÍযার নাটকে টিআরপি বেশি থাকত, তিনিই জনপ্রিয় হতেন। যেমন ধরুন সিকান্দার বক্স-এর মতো জনপ্রিয় নাটক, মানুষ পছন্দ না করলে তো সেটি এতটা জনপ্রিয় হতো না। তাই বিষয়টি আসলে একই। আগে ছিল টিআরপি, আর এখন চলে এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। পার্থক্য শুধু এতটুকুই যে, আগে দর্শক সংখ্যা বা কাটতি সাধারণ মানুষ দেখতে পারত না, আর এখন কোন নাটকে কেমন দর্শকপ্রিয়তা বা ভিউ হচ্ছে, তা সবাই সরাসরি দেখতে পাচ্ছে। এখন মাধ্যম অনেক বেড়ে গেছেÍইউটিউব, ওটিটি, ফেসবুকের ছোট ভিডিও বা রিলস। আজকাল এই রিলসের যুগে মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য প্রথম তিন সেকেন্ডের মধ্যেই একটি চমকপ্রদ মুহূর্ত বা হুক পয়েন্টের প্রয়োজন হয়, যা আগে ছিল না। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আমি এই বিষয়টিকে খুব একটা নেতিবাচকভাবে দেখি না। তবে আমরা শিল্পীরাই কিন্তু চাইলে দর্শকদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারি, আর তা সম্ভব কেবল মানসম্মত কাজের মাধ্যমেই। আমাদের দেশে এখন বেশ কিছু চমৎকার চলচ্চিত্র তৈরি হচ্ছে এবং মানুষ প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে সেগুলো দেখছেন, যা মাঝে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাই দর্শকদের আমরা আসলে কি দেখাতে চাই, সেই দায়িত্বটা আমাদের নিজেদেরই নিতে হবে। আমরা নিজেরা যদি মানসম্মত কাজের জায়গায় অনড় থাকি, তবে দর্শকদের রুচির স্তরও আমরাই পরিবর্তন করতে পারব।

ওটিটি বা মিউজিক ভিডিওতে এখন নাচের কোরিওগ্রাফিতে অনেক আধুনিকতা এসেছে। সমসাময়িক এই ট্রেন্ড বা ফিউশন ড্যান্সগুলোকে একজন ক্লাসিক্যাল ধারার নৃত্যশিল্পী হিসেবে কিভাবে দেখেন?

আমি এই বিষয়টিকে খুব ইতিবাচক এবং সুন্দরভাবেই দেখি। পর্দায় নতুন নতুন কিছু দেখতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। যেমন তামিল চলচ্চিত্রের যে নাচগুলো এখন দেখা যায়, তা আগে কখনো ওভাবে দেখা যায়নি। তারা যেভাবে নাচে, মনে হয় যেন তা অন্য কারো পক্ষে করা সম্ভব নয়। তাই আমারও খুব ইচ্ছে করে ওদের মতো করে নাচতে এবং আমি বাসায় সেই অনুযায়ী অনুশীলনও করি। এই পরিবর্তনকে আমি দারুণভাবে স্বাগত জানাই। কারণ শাস্ত্রীয় বা ক্লাসিক্যাল নাচকে ভেঙে যেমন আধুনিক নাচ তৈরি হয়েছে, তেমনি আধুনিক রূপকে ভেঙে হিপহপ কিংবা হাই হিল ড্যান্সের মতো আরও অনেক ধরনের নতুন শৈলী তৈরি হচ্ছে। এই পৃথিবীতে আমরা হরেক রকমের মানুষ আছি এবং সবার রুচিও এক নয়। সেই জায়গা থেকে এই বৈচিত্র্য আমার কাছে ভীষণ ভালো লাগে। একজন শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী হলেও, ভিন্ন ভিন্ন নাচের মাধ্যমে নিজেকে নতুনভাবে দেখার তীব্র ইচ্ছে আমার নিজেরও আছে।

কখনো উপস্থাপকের ভূমিকায় দেখার সম্ভাবনা আছে?

উপস্থাপনা করার প্রচুর প্রস্তাব আমার কাছে আসে, কিন্তু আমার ভীষণ ভয় লাগে। আমার সবসময় মনে হয় যে উপস্থাপনা করা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। এত বড় বড় গুণী মানুষদের সামনে দাঁড়িয়ে এতটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলাÍআমার পক্ষে হয়তো সম্ভব নয়। মূলত এই সংকোচ ও ভয়ের কারণেই আমি উপস্থাপনার কাজগুলো বিনম্রভাবে না করে দিই।

‘ফ্রড অ্যালার্ট’ নাটকের পরিচালকের বিরুদ্ধে পারিশ্রমিক না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাই

আসলে ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। নির্মাতা ফারহাদ আহমেদ ইশানের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে যোগাযোগ, পেশাদারিত্ব এবং পারিশ্রমিক দেওয়ার ক্ষেত্রে আমি গুরুতর সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি। গত সাত মাস ধরে আমার প্রাপ্য পারিশ্রমিকের জন্য অপেক্ষা করছি। উনি আমাকে কিছু টাকা দিলেও বাকি টাকা এখনো পরিশোধ করতে পারেননি, যা একপর্যায়ে আমি ছেড়েই দিয়েছি। কিন্তু মূল সমস্যা হলো, আমার পুরো দলের বা টিমের অনেকেই এখনো তাদের কষ্টের পাওনা টাকা বুঝে পাননি। আমার নিজের টাকা না পেলেও হয়তো মেনে নিতে পারতাম। কিন্তু যে প্রোডাকশন বয়রা দিন এনে দিন খায়, কিংবা যে নতুন ছেলেটি ভালো সুযোগের আশায় এই বিনোদন মাধ্যমে কঠোর পরিশ্রম করতে এসেছেÍতাদের পাওনাটুকু কেন আটকে থাকবে? প্রধান শিল্পী হিসেবে দলের বাকি সদস্যদের প্রতিও আমার একটা দায়িত্ব রয়েছে। তাই দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় সবাইকে সচেতন করতে এই পোস্টটি করেছি। আমি চাই, আমাদের এই মাধ্যমে কাজ শুরুর আগে সবাই চুক্তি ও আর্থিক বিষয়গুলো লিখিতভাবে নিশ্চিত করুক। আমাদের বিনোদন মাধ্যমে সততা ও পেশাদারিত্ব বজায় থাকুক, কোনো অসততা বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের স্থান যেন এখানে না হয়।