মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের জন্য হাসপাতালটি এখন রীতিমতো আতঙ্ক ও কষ্টের উৎসে পরিণত হয়েছে। হাসপাতালের আঙিনা থেকে শুরু করে অন্তর্বিভাগের বারান্দা পর্যন্ত সর্বত্র কুকুরের অবাধ বিচরণ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং রোগীদের ডায়েট চার্টার অনুযায়ী খাবার সরবরাহ না করার মতো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতায় স্বাস্থ্যসেবার এই কেন্দ্রটি এখন সেবা দেওয়ার পরিবর্তে ভোগান্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে শুরু করে প্রসূতি (ডেলিভারি) বিভাগের দ্বিতীয় তলার সিঁড়ি পর্যন্ত সবখানেই কুকুরের সরব উপস্থিতি। বহির্বিভাগের প্রধান ফটক এবং ফার্মেসির সামনে নিয়মিতভাবে একঝাঁক কুকুর শুয়ে থাকায় চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
চার বছরের শিশুকে নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা শামীম ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘টিকিট কাউন্টারে যাওয়ার আগেই গেটের সামনে কয়েকটি কুকুর দেখে আমার ছোট ছেলে ভয়ে কুঁকড়ে যায় এবং কান্না শুরু করে। হাসপাতালে এসে সুস্থ হওয়ার বদলে বরং কুকুর কামড়ানোর ভয়ে আতঙ্কিত থাকতে হচ্ছে। এমন একটি স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে এটি কি মেনে নেওয়া যায়?’
শুধু কুকুর নয়, হাসপাতালের ভেতরে চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশও রোগীদের কষ্ট বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফুয়াদ আলম নামে এক রোগীর স্বজন জানান, হাসপাতালের বারান্দায় থাকা শয্যার পাশেই বিড়ালের বিষ্ঠা ও নোংরা পড়ে থাকতে দেখা গেছে, যা থেকে উৎকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এসব দেখার যেন কেউ নেই।
বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসা সাজু নামে আরেক রোগী বলেন, টয়লেট ও শৌচাগারগুলোর অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে সেখানে পর্যাপ্ত পানি নেই, এমনকি ব্যবহারের জন্য একটি বদনা পর্যন্ত পাওয়া যায় না। অপরিচ্ছন্নতার চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকা এই হাসপাতালটির দিকে যেন কারো কোনো নজর নেই।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে রোগীদের খাবারের জন্য বরাদ্দ থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স তুলি এন্টারপ্রাইজ’ নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছে না। রোগীদের ডায়েট চার্টার অনুযায়ী পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার সরবরাহ না করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গত ৩১ মে ‘শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেয়াদহীন পাউরুটি ও নি¤œমানের কলা সরবরাহের অভিযোগ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর ১ জুন কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার সকালে ডায়েট চার্টার অনুযায়ী ভর্তিকৃত রোগীদের সকালের নাশতায় দুটি করে কলা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও অনেক শিশু ওয়ার্ডের রোগী অভিযোগ করেছেন, তাদের পাতে কোনো কলা জোটেনি। এমনকি রোগীদের পরিবেশন করা পাউরুটিগুলোও অত্যন্ত নি¤œমানের। গত বুধবার ভর্তি হওয়া অনেক রোগী রাতের খাবার পর্যন্ত পাননি বলে জানিয়েছেন। যথাযথ তদারকির অভাবে এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বারবার নিয়ম ভেঙে রোগীদের পুষ্টি থেকে বঞ্চিত করছে, যা নিয়ে সচেতন মহলে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
হাসপাতালটির সার্বিক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিষয়ে জানতে চাইলে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আকাশ নুনিয়া বলেন, অভিযোগের যে চিত্র আপনারা তুলে ধরেছেন, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমি এসব বিষয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে অবহিত করব।’
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, সরকারি হাসপাতাল একটি জীবন রক্ষার জায়গা। সেখানে রোগীদের এমন অবহেলা, নোংরা পরিবেশ ও অনিয়ম কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা অবিলম্বে হাসপাতালের পরিবেশ উন্নত করতে এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক পাকিজ মিয়া ত্রুটি স্বীকার করে দাবি করেন, কলা নিয়ে শুরুতে কিছুটা সমস্যা ছিল, যা পরে পরিবর্তন করা হয়েছে। আগামীতে খাবার সরবরাহের মান বজায় রাখার আশ্বাস দিচ্ছি।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন জানান, খাবারের অনিয়ম ও অন্যান্য অভিযোগের বিষয়গুলো আমি গুরুত্বসহকারে দেখছি। তদন্তপূর্বক দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আমি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। রোগীদের সেবা ও পরিবেশের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। দ্রুত এসব অব্যবস্থাপনা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হবে।

