ফুটবল মাঠে ট্রফি জেতা বা পরের রাউন্ডে যাওয়ার তাগিদ সবারই থাকে। কিন্তু প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক ওর্লান্দো হিলের জন্য এবারের বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইটি শুধু ফুটবলীয় মর্যাদার নয়, বরং নিজের হারিয়ে যাওয়া অতীত এবং এক আবেগঘন স্মৃতি ফিরে পাওয়ার যুদ্ধ। শেষ আটে যাওয়ার স্বপ্ন তো আছেই, তবে ফরাসিদের হারাতে পারলে কয়েক বছর আগে চরম আর্থিক সংকটে পড়ে বেচে দেওয়া নিজের যুব ক্যারিয়ারের প্রিয় জার্সিটি বিনামূল্যে ফেরত পাবেন হিল। তার এক বন্ধু হিলের সামনে জুড়ে দিয়েছেন এই কঠিন কিন্তু রোমাঞ্চকর শর্ত!
২০২৫ সালে প্যারাগুয়ে জাতীয় দলে অভিষেক হওয়া হিলের জীবনটা মোটেও সহজ ছিল না। ২০২২ সালের নভেম্বরে হিলের স্ত্রী মেলিসা আভালস গুরুতর স্বাস্থ্যগত জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। সময়ের আগেই জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাদের ছেলে লাউতারো পৃথিবীর আলো দেখলেও তাকে রাখা হয় আইসিইউতে। নবজাতকের জীবন বাঁচাতে এবং হাসপাতালের বিপুল খরচ মেটাতে নিজের বুট, স্নিকার্স থেকে শুরু করে অনূর্ধ্ব-২০ দলের প্রিয় জার্সিটি পর্যন্ত মাত্র ৩৩ ডলারে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন হিল। পরিবারকে নিয়ে ঘরে ফিরলেও সেদিন হিল ছিলেন একেবারে কপর্দকহীন।
ছয় ফুট ছয় ইঞ্চি উচ্চতার এই গোলরক্ষকের ক্যারিয়ারের উত্থানও রূপকথার মতো। আর্জেন্টিনার সান লরেন্সো ক্লাবে কেইলর নাভাস বা আন্দ্রিয়ান নোপোর্তের মতো তারকারা যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ভাগ্যের জোরে সুযোগ পান এই ‘অখ্যাত’ গোলরক্ষক। সুযোগ পেয়েই বাজিমাত করেন তিনি। ১৬ ম্যাচের ৯টিতেই জাল অক্ষত রেখে নজর কাড়েন প্যারাগুয়ে কোচ গুস্তাভো আলফারোর। চলতি বিশ্বকাপে সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪-১ গোলে হেরে যাত্রা শুরু করলেও, পরের ম্যাচগুলোতে হিল যেন পোস্টের নিচে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান। শেষ ৩২-এর ম্যাচে শক্তিশালী জার্মানির লক্ষ্যে থাকা ১৭টি শটের ১৬টিই ঠেকিয়ে ম্যাচ টাইব্রেকারে নিয়ে যান এবং সেখানে দুটি অনবদ্য সেভ করে জার্মানিকে বিদায় করে দলের নায়ক বনে যান হিল।
১৬ বছর পর প্যারাগুয়েকে বিশ্বকাপের নকআউটে তোলা হিলের সেই বিক্রি করে দেওয়া জার্সিটি কিনেছিলেন তারই এক বন্ধু পেদ্রো সুয়ারেস। জার্মানি বধের পর হিলকে এক বার্তায় সুয়ারেস বলেন, ‘জার্সি নিয়ে চিন্তা কোরো না, ওটা আমার কাছে নিরাপদে আছে। তবে এটা বিনা মূল্যে ফেরত পেতে হলে তোমাকে ফ্রান্সকে হারাতে হবে।’ বিশ্বমঞ্চে টিকে থাকা আর নিজের জীবনের সবচেয়ে আবেগের স্মৃতিটি ফিরে পেতে এমবাপ্পেদের ভয়ংকর আক্রমণভাগের সামনে হিল এখন কতটা দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারেন, সেটাই দেখার অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব।

