ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

কেন আটকে আছে কবরীর শেষ সিনেমা

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ২২, ২০২৬, ১২:৪৭ এএম

ঢাকাই চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের অবিসংবাদিত সম্রাজ্ঞী সারাহ বেগম কবরী অভিনয়ের গ-ি পেরিয়ে ২০০৬ সালে ‘আয়না’ সিনেমার মাধ্যমে পা রেখেছিলেন পরিচালনায়। এরপর দীর্ঘ ১৪ বছরের বিরতি ভেঙে তিনি হাত দিয়েছিলেন তার দ্বিতীয় এবং স্বপ্নের প্রজেক্ট ‘এই তুমি সেই তুমি’ সিনেমায়। ২০২০ সালে শুরু হওয়া সরকারি অনুদানের এই সিনেমাটির কাজ করোনা মহামারির মধ্যেও নিজের সবটুকু আবেগ ঢেলে চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু মাত্র দুই দিনের শুটিং বাকি থাকতে ২০২১ সালের ১৬ এপ্রিল করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিরবিদায় নেন এই গুণী নির্মাতা। তার চলে যাওয়ার পর থেকেই সিনেমাটির মুক্তি নিয়ে তৈরি হয়েছে এক অন্তহীন জটিলতা।

সিনেমাটি আটকে থাকার অন্যতম বড় কারণ হলো তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং প্রযোজনা পক্ষের ভেতরের তথ্যের গরমিল ও প্রশাসনিক লালফিতে বন্দি দাপ্তরিক প্রক্রিয়া। নিয়ম অনুযায়ী সরকারি অনুদানের সিনেমার কাজ শেষ হলে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে হয় এবং এরপরই শেষ কিস্তির টাকা ছাড় করা হয়।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রমতে, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সিনেমাটির শুটিং সম্পূর্ণ হওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য বা বকেয়া কিস্তির অর্থ সংক্রান্ত কোনো আবেদন এখন পর্যন্ত জমা পড়েনি। ফলে সরকারি রেকর্ডে সিনেমাটির অগ্রগতির কোনো আইনি প্রমাণ মেলেনি।

কবরীর মৃত্যুর পর ২০২৩ সালের শেষের দিকে তার ছেলে শাকের চিশতী সিনেমাটির বাকি কাজ, ডাবিং ও সম্পাদনা সম্পন্ন করেন। তবে নির্মাতা পক্ষের নতুন স্ট্র্যাটেজির কারণে দেশের প্রেক্ষাগৃহে এটি আসতে দেরি হচ্ছে।

 শাকের চিশতীর পরিকল্পনা অনুযায়ী, সিনেমাটি প্রথমে দেশের মাটিতে মুক্তি দেওয়া হবে না। এটি বেশ কয়েকটি নামকরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জমা দেওয়া হয়েছে। তার আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রদর্শনের প্রস্তুতি এখনো চলছে। সিনেমাতে সাবটাইটেল যুক্ত করা হচ্ছে এবং দেশে মুক্তির প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, সেন্সর ছাড়পত্রের জন্য সার্টিফিকেশন বোর্ডে জমা পড়েছে সিনেমাটি। ছাড়পত্র পেলেই দেশে মুক্তি দেওয়া হবে।

বিদেশে আন্তর্জাতিক উৎসবগুলোতে প্রদর্শনী সফলভাবে শেষ হওয়ার পরই কেবল বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে বাণিজ্যিকভাবে সিনেমাটি মুক্তি পাবে। এই প্রক্রিয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় দেশের দর্শকরা সিনেমাটি দেখার সুযোগ পাচ্ছেন না।

কিন্তু এখানেই দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, সরকারি অনুদানের কোনো সিনেমা বিদেশের উৎসবে পাঠাতে হলে মন্ত্রণালয়কে জানানোর নিয়ম রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদনও নিতে হয়। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিনেমাটি সার্টিফিকেশনের জন্য জমা পড়েনি। ফলে সিনেমার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বোর্ডের কাছে কোনো তথ্য নেই।

কবরী বেঁচে থাকাকালীন খুব দ্রুত সিনেমাটি শেষ করতে চেয়েছিলেন। তবে তার মৃত্যুর পর অভিভাবকহীন হয়ে পড়া সিনেমাটি নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে শাকের চিশতী হাল ধরলেও সম্পূর্ণ নতুন একজন পরিচালকের পক্ষে মায়ের কাজের মূল সুর বজায় রেখে পোস্ট-প্রোডাকশন (সম্পাদনা, কালার গ্রেডিং, সাউন্ড ডিজাইন) শেষ করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

মুক্তিযুদ্ধ এবং সমসাময়িক বর্তমানÍএই দুই সময়ের সমান্তরাল এক গল্প নিয়ে সিনেমাটির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন কবরী নিজেই। এই সিনেমার মাধ্যমেই কবরী তার জীবনে প্রথমবার কোনো সিনেমার জন্য গান লিখেছিলেন। সিনেমাটির গানগুলোর সুর ও সংগীত পরিচালনা করেছেন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন। এর কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন নিশাত নাওয়ার সালওয়া ও রায়হান রিয়াদ।

‘এই তুমি সেই তুমি’ শুধু একটি সিনেমাই নয়, এটি ঢাকাই সিনেমার ‘মিষ্টি মেয়ে’র শেষ ইচ্ছার এক জীবন্ত দলিল। রুপালি পর্দার এই কালজয়ী অভিনেত্রীর শেষ সৃষ্টি এভাবে প্রশাসনিক চিঠি চালাচালি আর উৎসবের বেড়াজালে আটকে থাকবে, নাকি দ্রুত সব জটিলতা কাটিয়ে প্রেক্ষাগৃহের বড় পর্দায় আলোর মুখ দেখবেÍসেই প্রতীক্ষায় চাতক পাখির মতো চেয়ে আছেন কোটি বাংলা সিনেমাপ্রেমী।