খুলনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প দীর্ঘ ১৪ বছরেও শেষ না হওয়ায় নগরবাসীর দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। ২০১২ সালে শুরু হওয়া ৩ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পে একাধিকবার ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধি করা হলেও এখনো সম্পূর্ণ হয়নি কাজ। এরই মধ্যে প্রকল্পে অনিয়ম, অতিরিক্ত বিল পরিশোধ ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সব বিতর্কের মধ্যেই আবারও ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব একনেক সভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি ২০১২ সালে ৯৮ দশমিক ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে গ্রহণ করা হয় এবং ২০১৩ সালের ৩০ জুলাই একনেক সভায় অনুমোদন পায়। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৪ সালের ৩০ জুন। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে ব্যয় ও মেয়াদ একাধিকবার বৃদ্ধি করা হয়।
দ্বিতীয় দফায় প্রকল্প ব্যয় ১২৬ দশমিক ৫৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়। পরে তৃতীয় দফায় ব্যয় বৃদ্ধি করে ২৫৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। এ ব্যয় বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ বণ্টনের অভিযোগ ওঠে, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়।
প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় আতাউর রহমান লিমিটেড ও মাহাবুব ব্রাদার্স লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগ। তবে কাজ চলমান অবস্থায় ২০২৪ সালের ২১ মে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় চতুর্থবারের মতো প্রকল্পের ব্যয় ২৫৪ কোটি টাকায় পুনর্নির্ধারণ এবং মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। এর মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণে ৯৯ কোটি টাকা এবং ভৌত নির্মাণকাজে ১৫৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়।
সূত্রের দাবি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহাবুব ব্রাদার্স কাজ সম্পন্ন না করেই ভৌত নির্মাণকাজের বিপরীতে ৭০ দশমিক ৩৬ কোটি টাকার বিল উত্তোলন করেছে। এ ছাড়া কাজ না হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন খাতে বিল পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে প্রকল্পের বিভিন্ন অসংগতি উঠে এসেছে বলেও সূত্র জানিয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন অংশে কার্পেটিংয়ের কাজ না হলেও সেই খাতে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। আরও কয়েকটি কাজ বাস্তবে সম্পন্ন না হলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে অর্থ প্রদান করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রকল্পের কাজ করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়। এরপর প্রকল্পের ভবিষ্যৎ বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মো. আরমান হোসেন শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে স্থানীয় নাগরিক নেতাদের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নে তদারকির ঘাটতি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এ বিষয়ে দুদকে অভিযোগও দেওয়া হয়েছে।
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন (পিএসসি) বলেন, পূর্ববর্তী সময়ের ঘটনাগুলোর সঙ্গে তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন না। তবে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির বেহাল অবস্থার কারণে পূর্বের বরাদ্দে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে আগামী একনেক সভায় প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে। প্রয়োজনে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব অন্য কোনো সরকারি সংস্থাকেও দেওয়া যেতে পারে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে চলমান প্রকল্পের কারণে নগরবাসী ধুলোবালি, জলাবদ্ধতা ও যানজটের দুর্ভোগে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। স্থানীয়দের প্রশ্ন, বারবার ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানোর পরও কেন একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের কাজ শেষ হচ্ছে না। নতুন করে ব্যয় বৃদ্ধির উদ্যোগ সেই প্রশ্নকেই আরও জোরালো করেছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন