কুড়িগ্রামের উলিপুরে সরকারি অর্থায়নে সড়ক সংস্কারকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও নি¤œমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সরকারি নির্দেশনা ও প্রকৌশল মানদ-কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চরম তড়িঘড়ি করে কাজ সম্পন্ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এমনকি দিনের আলোয় অনিয়ম ঢাকতে রাতের আঁধারে বিটুমিন প্রাইম কোট (তেল) ছাড়াই কার্পেটিং করার গুরুতর অভিযোগও পাওয়া গেছে।
এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার তবকপুর ইউনিয়নের রেলগেট বাজার থেকে কবিরাজপাড়া এবং রেলগেট বাজার থেকে ফয়জার মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়ক সংস্কারকাজের চুক্তিমূল্য ১ কোটি ৩৬ লাখ ২৩ হাজার ৭৯৭ টাকা। এত বড় অঙ্কের সরকারি বাজেটে জনগুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের নির্মাণকাজ হলেও শুরু থেকেই এর গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
গত মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, আগের দিন সোমবার রাত থেকে জাফর মিয়ার বাড়ির সামনে থেকে বাবলু মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত অংশে ঘুটঘুটে অন্ধকারে কার্পেটিংয়ের কাজ চলছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাস্তার বেড় তৈরিতে অত্যন্ত নি¤œমানের ইটের খোয়া ও রাবিশ ব্যবহার করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী রাস্তা ঝাড়– দিয়ে ধুলোবালু ও ময়লা পরিষ্কার করে বিটুমিন প্রাইম কোট দেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। ময়লা-আবর্জনার ওপরই পিচ ঢেলে কার্পেটিং করা হয়েছে। ফলে কাজ শেষ হতে না হতেই শ্রীবল্লভ কবিরাজপাড়া এলাকার কয়েকটি স্থানে কার্পেটিং আলগা হয়ে উঠে গেছে এবং রাস্তার কিনারায় বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও কাজ শেষ হওয়ামাত্র দুই দিনের মধ্যেই পিচ উঠে মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তফা কামাল, ঈমান আলী ও সিরাজুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাস্তা ভালোভাবে পরিষ্কার না করেই তড়িঘড়ি করে পিচ ঢালা হচ্ছে। ফলে হাত দিয়েই কার্পেটিং টেনে তোলা যাচ্ছে। সরকারি টাকায় নির্মিত সড়কে এমন হরিলুট ও অনিয়ম কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তারা আরও জানান, প্রকল্পের শুরু থেকেই কাজের গুণগত মান নিয়ে এলাকাবাসী আপত্তি জানালেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা তদারকি কর্মকর্তারা কোনো কর্ণপাত করেননি।
এদিকে নকশা অনুযায়ী সড়ক কার্পেটিংয়ের পুরুত্ব প্রায় ২৫ মিলিমিটার (১ ইঞ্চি) হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা অর্ধেকেরও কম দেওয়া হচ্ছে এবং পর্যাপ্ত রোলার ব্যবহার না করায় কার্পেটিং আলগা হয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি কোনো সদুত্তর না দিয়ে সাংবাদিকদের উপজেলা প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার বলেন, ‘আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম এবং কাজ বন্ধ রাখতে বলেছিলাম। এর পরও তারা কাজ করছে। এখন কি আমি মারামারি করে কাজ বন্ধ করব?’
একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রকৌশলীর এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, খোদ প্রকৌশলীর নির্দেশ অমান্য করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কীভাবে কাজ চালিয়ে যায় এবং কেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? এর পেছনে কোনো গোপন যোগসাজশ রয়েছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় ও জনগণের ভোগান্তি রোধে এই সড়ক প্রকল্পের কাজ দ্রুত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে যাচাই করা হোক এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ঠিকাদার ও অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অন্যথায় কোটি টাকার এই সড়ক অল্প সময়ের মধ্যেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।
এদিকে কুড়িগ্রাম এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি নিজেই সাইট পরিদর্শন করেছি এবং ল্যাব পরীক্ষার জন্য কার্পেটিংয়ের নমুনা সংগ্রহ করেছি। পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম আরিফের বক্তব্য জানতে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন