ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে এটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হতে যাওয়া এই বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বাজেট হতে যাচ্ছে।
সরকারের ঘোষিত ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বি-নিয়ন্ত্রণকরণ: সবার জন্য উন্নয়ন’ দর্শনকে সামনে রেখে প্রস্তাবিত বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। বাজেটে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের এটি প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। আগামী ১৫ জুন চলতি অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট পাস হওয়ার পর ১৬ জুন থেকে নতুন বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হবে। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে বাজেট পাসের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়নের তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়নকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ কারণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় শিল্পের বিকাশ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণা আসতে পারে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বাজেটে থাকতে পারে। এছাড়া বিদেশে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ এবং তরুণদের সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হতে পারে।
ব্যবসা পরিচালনা সহজ করতে ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে লাইসেন্স, অনুমোদন ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক সেবা একক প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রম আরও ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অনলাইনে কর রিটার্ন দাখিল, দ্রুত কর ফেরত এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। রাজস্ব আয়ের পরও বাজেটে প্রায় ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি থাকতে পারে। এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। বাকি অর্থ বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে সংগ্রহ করা হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফিরিয়ে আনা আগামী অর্থবছরে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তবে নীতিনির্ধারকরা আশা করছেন, চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন