× UCB Sticker Card
শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মুজিবুর রহমান রঞ্জু, পূর্বাঞ্চল 

প্রকাশিত: জুন ১৩, ২০২৬, ০৬:১২ এএম

বালু লুটে বিপন্ন পাহাড়ি ছড়া

মুজিবুর রহমান রঞ্জু, পূর্বাঞ্চল 

প্রকাশিত: জুন ১৩, ২০২৬, ০৬:১২ এএম

বালু লুটে বিপন্ন পাহাড়ি ছড়া

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়া থেকে অবৈধভাবে নিষিদ্ধ সিলিকা বালু উত্তোলন করে নিচ্ছে একটি চক্র। পাশাপাশি নদী ও কৃষিজমিতে জমে থাকা বালুও অবাধে উত্তোলন করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান, মামলা ও জরিমানার পরও থামছে না বালুখেকোদের তৎপরতা। এতে একদিকে সরকার বছরে অন্তত ৬ থেকে ৭ কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ, কৃষিজমি, গ্রামীণ অবকাঠামো ও জননিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

সম্প্রতি চার দিনের অভিযানে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে অবৈধভাবে উত্তোলিত প্রায় ১০ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। এ সময় বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত তিনটি মেশিনসহ বিভিন্ন সরঞ্জামও জব্দ করা হয়।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মহিবুল্লাহ আকনের নেতৃত্বে শনিবার ১ হাজার ৫০০ ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়। এর আগে মঙ্গলবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ভূনবীর ইউনিয়নের তিনটি স্থানে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ৬ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়। একই সময়ে ভূনবীরের নতুন বাগান এলাকা থেকে আরও ২ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়।

উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (সংশোধিত ২০২৩) অনুযায়ী পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতে ১০ জনকে মোট ৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সিন্দুরখান, ভূনবীর, মতিগঞ্জ ও কালাপুরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২৫টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে একাধিক এক্সকাভেটর মেশিন জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে এবং প্রায় ৩০ হাজার ঘনফুট অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু জব্দ ও বিনষ্ট করা হয়েছে।

অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে এলাকায় প্রায়ই সংঘর্ষ, হামলা, সড়ক দুর্ঘটনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। সম্প্রতি একটি বালুবাহী ডায়না ট্রাকের চাপায় ছয়জন আহত হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় জনতা গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং শ্রীমঙ্গল-মির্জাপুর সড়ক অবরোধ করে।

শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযানের সময় একটি বালুবাহী ডায়না ট্রাক পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইককে চাপা দেয়। এতে চালকসহ ছয়জন আহত হন। আহতরা হলেন শিপন মিয়া (২৫), রাসেল (২১), গিয়াস মিয়া (২৪), রুবেল মিয়া (৩৫), জাকির মিয়া (১৭) ও মারজান আহমেদ (১৮)।

ঘটনার পর উত্তেজিত জনতা ডায়না গাড়িটি ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং সড়কে অবরোধ সৃষ্টি করে। ফলে প্রায় চার ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ ঘটনায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরাও হামলার শিকার হন। দুর্বৃত্তরা একুশে টেলিভিশনের একটি সানগান ছিনিয়ে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত ২ মে ভূনবীর ও মির্জাপুর এলাকায় পরিবেশ ধ্বংস করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি করেন ভূনবীর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিমেল পাল। মামলায় বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলা সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি ছড়া ও কৃষিজমি সংলগ্ন এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছিল। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষিজমি, বসতভিটা ও স্থানীয় অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

শ্রীমঙ্গলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ৩০টিরও বেশি পাহাড়ি ছড়া হাইল হাওরে গিয়ে মিলিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বর্মাছড়া, উদনাছড়া, হরিণছড়া, পুটিয়াছড়া, বিলাশছড়া, ফুলছড়া, কাকিয়াছড়া, আমরাইলছড়া, ইছামতিছড়া, ভুড়ভুড়িয়া ছড়া, জাগছড়া, সুনাছড়া, নারাইনছড়া, বৌলাছড়া, গিলাছড়া, শিয়ালছড়া, খাইছড়া ও শাখামোড়া ছড়া। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ছড়ার অনেকগুলো থেকেই নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় মোট ২৬টি বালুমহাল রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে শুধু বিলাশছড়া বন্দোবস্তের আওতায় রয়েছে। আইনগত জটিলতার কারণে বাকি মহালগুলো দীর্ঘদিন ধরে বন্দোবস্ত দেওয়া সম্ভব হয়নি। বর্তমানে ব্যবসায়ী মো. সেলিম মিয়া বছরে ৬৫ লাখ টাকা রাজস্ব দিয়ে বিলাশছড়ার বালুমহাল বন্দোবস্ত নিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সব বালুমহাল বন্দোবস্তের আওতায় আনা গেলে সরকার বছরে কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে পারত।

বিলাশছড়া বালুমহালের বন্দোবস্ত গ্রহীতা সেলিম মিয়া বলেন, বছরে ৬৫ লাখ টাকা বন্দোবস্ত মূল্য দিয়ে তিনি ঘাটটি নিয়েছেন। কিন্তু একটি অবৈধ চক্র তার এলাকা থেকেও রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন করছে। এ ব্যাপারে তিনি প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মহিবুল্লাহ আকন বলেন, ‘অবৈধ বালু উত্তোলন ও মাটি কাটার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত কয়েক মাসে একাধিক অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা, বালু জব্দ ও মেশিন ধ্বংস করা হয়েছে।’

শ্রীমঙ্গল থানার ওসি (তদন্ত) আব্দুর রাজ্জাক জানান, অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় থানায় একাধিক নিয়মিত মামলা রয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ ও জনগণের সহযোগিতায় ভারী যানবাহন নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবন্ধকতাও তৈরি করা হয়েছে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আইনগত জটিলতার কারণে সব ছড়া বন্দোবস্তের আওতায় না থাকলেও কেউ যাতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। পরিবেশ ও কৃষিজমি রক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।’

মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মাধ্যমে সরকারকে বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এখন এটি চলবে না। দলমত নির্বিশেষে যারা এ কাজে জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সব বালুমহালকে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় পরিবেশ ধ্বংস, কৃষিজমির ক্ষতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!