ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

মুমিনুল ইসলাম, ধামইরহাট (নওগাঁ)
প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২৬, ০৬:১৯ এএম

সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে পরিচিত নওগাঁ। এ জেলার মাটিতে ছড়িয়ে আছে নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন ও দর্শনীয় স্থান। এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম প্রতœতাত্ত্বিক স্থাপনা পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার (সোমপুর মহাবিহার), কৈবর্ত বিদ্রোহের স্মৃতিবিজড়িত বিবরদিঘি, ঐতিহাসিক মাহি সন্তোষ মাজার, দুবলহাটি রাজবাড়ী, পতিসরের রবীন্দ্র কুঠিবাড়িসহ রয়েছে বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এসব ঐতিহ্যের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে জেলার ধামইরহাট উপজেলার সীমান্তঘেঁষা আলতাদিঘি জাতীয় উদ্যান।

জেলা শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জাতীয় উদ্যান বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। বিশাল শালবন, বেতবাগান ও সবুজের সমারোহের মাঝে অবস্থিত ৪৩ একর আয়তনের ঐতিহাসিক আলতাদিঘি এ উদ্যানের প্রধান আকর্ষণ। এই দিঘিকে ঘিরেই জাতীয় উদ্যানটির নামকরণ করা হয়েছে। সারাবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এখানে ছুটে আসেন। বিশেষ করে ঈদ, সরকারি ছুটি ও উৎসবের সময় পর্যটকদের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। তবে সম্ভাবনাময় এই পর্যটনকেন্দ্রটি বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে একদিকে যেমন সৌন্দর্য হারাচ্ছে, অন্যদিকে ঝুঁকিতে পড়ছে পর্যটকদের নিরাপত্তা।

আলতাদিঘি জাতীয় উদ্যানে প্রবেশের প্রধান সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে সরু অবস্থায় রয়েছে। উপজেলা সদর থেকে প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার দূরের এই সড়কে ছোট যানবাহন চলাচল করতে পারলেও বড় গাড়ি, বিশেষ করে পর্যটকবাহী বাস ও মাইক্রোবাস চলাচলে সমস্যায় পড়তে হয়।

অনেক সময় বড় বাস উদ্যানে প্রবেশ করতে না পেরে পর্যটকদের আগেই নেমে হেঁটে যেতে হয়। এতে সময় নষ্টের পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়েন দর্শনার্থীরা। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ সৃষ্টি হলে পুরো সড়কে যানজটের পরিস্থিতি তৈরি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের দীর্ঘদিনের দাবি-পর্যটনের স্বার্থে দ্রুত এই সড়ক প্রশস্ত করা হোক।

উদ্যানের অন্যতম আকর্ষণ ওয়াচ টাওয়ার। দিঘির পাশে নির্মিত প্রায় ৭০ ফুট উঁচু এই টাওয়ার থেকে পর্যটকরা পুরো উদ্যানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেন। কিন্তু বর্তমানে টাওয়ারটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

সরেজমিনে দেখা যায়, ওয়াচ টাওয়ারের এসএস পাইপের তৈরি গার্ড রেলিংয়ের বেশ কিছু অংশ ভেঙে গেছে। কোথাও কোথাও রেলিং চুরি হয়ে গেছে। ফলে টাওয়ারে ওঠা দর্শনার্থীদের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেকোনো সময় অসতর্কতায় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।

কয়েক বছর আগে আলতাদিঘি জাতীয় উদ্যান সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় দিঘির চারপাশের বেশ কিছু পুরোনো গাছ অপসারণ, দিঘি খনন ও পাড় বাঁধাইয়ের কাজ করা হয়। কিন্তু সংস্কারের পরও দিঘিটি দীর্ঘস্থায়ী জলাধারে পরিণত হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষাকাল ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময় ৪৩ একর আয়তনের বিশাল দিঘিটি প্রায় শুকনো থাকে। এতে উদ্যানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনেকটাই কমে গেছে। বিষয়টি নিয়ে পরিবেশ সচেতন মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

দিঘির চারপাশে নতুন করে গাছ লাগানো হলেও সেগুলোও এখন হুমকির মুখে। কারণ উদ্যানের ভেতরে অবাধে গরু-ছাগল প্রবেশ করছে। এতে নতুন গাছ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি দিঘির পশ্চিম অংশ অনেকটা গোচারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে।

গবাদিপশুর বর্জ্যরে কারণে পর্যটকদের স্বাভাবিক চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। পাশাপাশি উদ্যানের পরিবেশগত ভারসাম্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সম্প্রতি ভারী বৃষ্টির কারণে দিঘির চারপাশে পর্যটকদের চলাচলের জন্য নির্মিত রাস্তা ও পাড়ের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, কয়েকটি স্থানে বড় ধরনের গর্ত তৈরি হয়েছে। এসব গর্ত দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে পর্যটকরা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। এ ছাড়া দিঘির চারপাশে নির্মিত ঢালাই রাস্তার কিছু অংশও ভেঙে গেছে। দ্রুত সংস্কার করা না হলে ভবিষ্যতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের দাবি, আলতাদিঘি জাতীয় উদ্যানের উন্নয়ন ও সংস্কার হতে হবে পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক পরিবেশকর্মী আলমগীর কবির বলেন, ‘উদ্যান সংস্কারের পর কাঠামোগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে বর্তমানে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ৪৩ একর আয়তনের দিঘি খননের পরও কেন পানির স্থায়িত্ব থাকছে না, তা নিয়ে ভূতাত্ত্বিক জরিপ প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, ‘আলতাদিঘি জাতীয় উদ্যান শুধু ধামইরহাট নয়, পুরো উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন সম্পদ। এটি রক্ষায় বন বিভাগকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’ ধামইরহাট উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আব্দুর রউফ বলেন, ‘আলতাদিঘি এ এলাকার গর্ব। এটি রক্ষার দায়িত্ব সবার। কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে।’

ধামইরহাট মানসেবা সংগঠনের সভাপতি রাসেল হোসেন বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে এখানে বিপুলসংখ্যক পর্যটক আসে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো দ্রুত মেরামত করা প্রয়োজন।’

এ বিষয়ে বনবিট রেঞ্জ কর্মকর্তা ফরহাদ জাহান বলেন, ‘সমস্যাগুলো সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। তবে লোকবল সংকটের কারণে সবকিছু একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’ তিনি জানান, প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে বিষয়গুলো দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি জাতীয় উদ্যানের সৌন্দর্য ও সম্পদ রক্ষায় সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য এই আলতাদিঘি জাতীয় উদ্যানকে টিকিয়ে রাখতে এখন প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম। তা না হলে সম্ভাবনাময় এই পর্যটনকেন্দ্রটি ধীরে ধীরে হারাতে পারে তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও আকর্ষণ।