ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

বর্ষায় প্রাণ ফিরেছে ঝরনাগুলোতে

ফিরোজ মাহমুদ, মিরসরাই (চট্টগ্রাম)
প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২৬, ০৬:২১ এএম

বর্ষার বৃষ্টিতে নতুন রূপে সেজেছে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার পাহাড়ি ঝরনাগুলো। বছরের অন্য সময় পানির প্রবাহ কম থাকলেও বর্ষা মৌসুমে টইটম্বুর হয়ে উঠেছে এসব ঝরনা। পাহাড় বেয়ে নেমে আসা স্বচ্ছ পানির ধারা আর সবুজ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন শত শত পর্যটক।

বিশেষ করে সরকারি ছুটি ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে পর্যটকদের ভিড় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বন্ধু, সহপাঠী, পরিবার ও স্বজনদের নিয়ে পাহাড়ি ঝরনার পানিতে ভিজতে এবং প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটকদের আগমন এখন চোখে পড়ার মতো।

মিরসরাই উপজেলা সারাদেশে ‘ঝরনার রানি’ হিসেবে পরিচিত। এখানকার পাহাড়ি ঝরনাগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। উপজেলার রূপসী ঝরনা, হরিণাকু- ঝরনা, নাপিত্তাছড়া ঝরনা, সোনাইছড়ি ঝরনা, বোয়ালিয়া ঝরনা, খৈয়াছড়া ঝরনা ও মেলখুম ট্রেইলসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে সারা বছরই ভ্রমণপিপাসুদের আনাগোনা থাকে। তবে বর্ষায় ঝরনাগুলোর সৌন্দর্য যেমন বেড়ে যায়, তেমনি বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও। পর্যটকদের অসচেতনতা, পাহাড়ি পথ সম্পর্কে অনভিজ্ঞতা এবং অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়ার কারণে প্রতি বছরই এসব এলাকায় দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে। তাই নিরাপদ ভ্রমণে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, রূপসী, নাপিত্তাছড়া ও খৈয়াছড়া ঝরনার প্রবেশপথে পর্যটকদের বহনকারী বাস, মাইক্রোবাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির সারি। অনেকে স্থানীয় যানবাহনে এসে রাস্তার মাথা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ঝরনার উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছেন। পর্যটক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে স্থানীয় ব্যবসা ও বিভিন্ন সরঞ্জাম বিক্রিও।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের আওতাধীন বারৈয়ারঢালা জাতীয় উদ্যানের প্রায় ২ হাজার ৯৩৫ একর বনাঞ্চলজুড়ে রয়েছে খৈয়াছড়া, নাপিত্তাছড়া, রূপসী, সোনাইছড়ি ও বাওয়াছড়া ঝরনা। আকৃতি ও সৌন্দর্যের কারণে খৈয়াছড়া, নাপিত্তাছড়া ও রূপসী ঝরনায় পর্যটকের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি।

ঝরনাগুলোর নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় ২০১০ সাল থেকে ইজারা দিয়ে আসছে বন বিভাগ। চলতি বছরের ২৩ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৪ মে পর্যন্ত এক বছরের জন্য ৪০ লাখ ১০০ টাকায় থ্রি-বি নামের একটি প্রতিষ্ঠান ঝরনাগুলোর ইজারা পেয়েছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সারা বছরই পর্যটকেরা এসব ঝরনায় এলেও বর্ষায় পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় পর্যটকের চাপ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। এবার বৈশাখের ভারী বৃষ্টি ও ঈদের দীর্ঘ ছুটির কারণে ঝরনাগুলোতে পর্যটকের সংখ্যা আরও বেড়েছে। সরকারি ছুটির দিনে শুধু খৈয়াছড়া ঝরনাতেই দুই থেকে আড়াই হাজারের বেশি পর্যটকের সমাগম ঘটে।

কুমিল্লা থেকে আসা পর্যটক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মিরসরাইয়ের অনেক ঝরনায় গিয়েছি। এবার প্রথম রূপসী ঝরনায় এলাম। রেললাইন পার হয়ে ঝরনার পথে দুপাশের সবুজ পাহাড় ও প্রকৃতির দৃশ্য খুবই ভালো লেগেছে।’

ঢাকা থেকে আসা পর্যটক নাজমুল হক বলেন, ‘চার বন্ধু মিলে নাপিত্তাছড়া ঝরনা দেখতে এসেছি। সবুজ পাহাড়, পাথুরে ঝিরিপথ আর ঝরনার স্বচ্ছ পানি দেখে মন ভরে গেছে। খৈয়াছড়া ঝরনায় আগে গিয়েছিলাম, তবে দুই ঝরনার সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য আলাদা।’

রূপসী ঝরনার ইজারা পাওয়া থ্রি-বি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এস এম হারুন বলেন, ‘বর্ষাকালে পর্যটকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি থাকে। নিরাপদ পর্যটন নিশ্চিত করতে প্রবেশপথে সচেতনতামূলক ব্যানার, পোস্টার ও প্রচার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। পর্যটকদের সঙ্গে গাইড নেওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।’

বারৈয়ারঢালা রেঞ্জ কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, ‘এ বছর বৈশাখ থেকেই ঝরনাগুলোতে পানির প্রবাহ তৈরি হয়েছে। ঈদের কারণে পর্যটকের সংখ্যাও বেড়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইজারাদারের সঙ্গে সমন্বয় করে হ্যান্ডমাইকে প্রচার, নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।’

মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার বলেন, ‘প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে মিরসরাইয়ের পাহাড়ি ঝরনাগুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন পর্যটক আসছেন। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, বন বিভাগ ও ইজারাদার সমন্বিতভাবে কাজ করছে।’ তিনি আরও বলেন, ঝরনায় দুর্ঘটনা এড়াতে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, ট্যুরিস্ট গাইড, সংবাদকর্মী, ইজারাদার ও স্থানীয়দের নিয়ে প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হবে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের আধার মিরসরাইয়ের ঝরনাগুলো বর্ষায় নতুন প্রাণ ফিরে পেলেও নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।