ঢাকা মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

তীব্র গরমে তালের শাঁসের বাজার জমজমাট

বেনাপোল প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২৬, ০৬:৩২ এএম

আষাঢ়ের তীব্র দাবদাহে হাঁসফাঁস অবস্থা জনজীবনে। প্রচ- গরমে শরীরের পানিশূন্যতা দূর করতে, সাময়িক স্বস্তি পেতে এবং পুষ্টির চাহিদা মেটাতে যশোরের শার্শা ও বেনাপোল এলাকায় বেড়েছে তালের শাঁসের কদর। প্রাকৃতিকভাবে শীতল ও পুষ্টিকর হওয়ায় গরমের এই সময়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে মৌসুমি এই ফল।

শার্শা উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বিভিন্ন হাট-বাজারের মোড়ে এখন দেখা মিলছে তালের শাঁস বিক্রেতাদের। পাশাপাশি ভ্যানযোগে ভ্রাম্যমাণভাবে বিক্রিও চলছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ, পথচারী এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে তালের শাঁসের চাহিদা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের জন্য বাড়িতেও নিয়ে যাচ্ছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার শতাধিক পরিবার মৌসুমি এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। চলতি মৌসুমে ফলন কম হওয়ায় বাজারে সরবরাহ তুলনামূলক কম। ফলে দামও কিছুটা বেশি। বর্তমানে প্রতিটি তালের শাঁস ১৫ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মৌসুমি ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার জানান, তিনটি তালগাছের ফল ৪ হাজার টাকায় কিনেছেন। গাছ থেকে তাল নামাতে দুই শ্রমিককে দিতে হয়েছে ১ হাজার টাকা এবং পরিবহন খরচ হয়েছে ২০০ টাকা। তিনি বলেন, ‘আমি মূলত পেয়ারা ব্যবসা করি। তবে মৌসুমে তালের শাঁস বিক্রি করি। প্রায় এক থেকে দেড় মাস এই ব্যবসা করা যায়। এতে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় সম্ভব।’

নাভারণ ও বাগআঁচড়া এলাকার বিক্রেতা সালাউদ্দিন ও আশিকুর জানান, এ বছর তালের ফলন কম হওয়ায় বাজারে সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তারা জানান, প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করছেন। তাদের মতে, প্রচ- গরমে স্বস্তি পেতে শৌখিন ক্রেতা থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরাও তালের শাঁস কিনতে ভিড় করছেন।

পৌর এলাকার বিক্রেতা আব্দুস সামাদ বলেন, গ্রামের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কচি তালের ফল সংগ্রহ করেন তিনি। তালের আকার ও সংখ্যাভেদে একটি গাছের ফল ৮০০ থেকে এক হাজার টাকায় কেনা হয়। তিনি জানান, প্রতিদিন পাইকারি ও খুচরা মিলিয়ে এক হাজার থেকে তিন হাজার টাকার তালের শাঁস বিক্রি করেন।

আরেক বিক্রেতা আনিছুর রহমান বলেন, ‘এই মৌসুমে শতাধিক মানুষ তালের শাঁস বিক্রির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অনেক ক্রেতাই নিজেরা খাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের জন্যও কিনে নিয়ে যান।’

ক্রেতা আরিফ বলেন, ‘তালের শাঁস সুস্বাদু ও মৌসুমি একটি ফল। প্রতি বছর এই সময়ে এটি খাওয়ার চেষ্টা করি। আজ মেয়ের জন্য কিনতে এসেছি।’

স্থানীয়দের মতে, দাবদাহে তালের শাঁস শুধু স্বস্তির উৎস নয়, এটি পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। তবে একসময় শার্শা-বেনাপোল অঞ্চলে প্রচুর তালগাছ থাকলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে এসেছে। বয়স্ক গাছ কেটে ফেলা, রোগব্যাধি, পরিচর্যার অভাব এবং আর্থিক সংকটের কারণে তালগাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

শার্শা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা বলেন, ‘চলতি মৌসুমে তালের ফলন কম হওয়ায় বাজারে আনা শাঁস দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। তালগাছ শুধু ফলের উৎস নয়, এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিচর্যার অভাবে এ অঞ্চলে তালগাছ এখন বিলুপ্তপ্রায়। ফলে ঐতিহ্যবাহী তালের রস, গুড় ও পাটালিও হারিয়ে যেতে বসেছে।’

প্রচ- দাবদাহে তালের শাঁস যেমন মানুষের জন্য সাময়িক প্রশান্তির উৎস হয়ে উঠেছে, তেমনি অনেক পরিবারের জীবিকারও অবলম্বন। তবে এই ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ টিকিয়ে রাখতে তালগাছ সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।