উৎপাদন খরচ বেড়েছে, বেড়েছে শ্রম ও দুশ্চিন্তাও। কিন্তু সে তুলনায় বাড়েনি ভুট্টার বাজারদর। বরং গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে ভুট্টার দাম কমে যাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন রংপুর অঞ্চলের হাজারো কৃষক। তিস্তা, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদীবেষ্টিত বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের কৃষকেরা জানান, এবার বীজ, সার, ডিজেল ও শ্রমিকের খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতি বিঘায় অতিরিক্ত ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। অথচ বাজারে প্রতিকেজি ভুট্টা বিক্রি করতে হচ্ছে গত বছরের তুলনায় ২ থেকে ৩ টাকা কম দামে। কৃষকদের ভাষ্য, গত বছর এ সময়ে স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি ভুট্টা ২৯ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হলেও চলতি মৌসুমে তা নেমে এসেছে ২৭ থেকে ২৮ টাকায়। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও কাক্সিক্ষত দাম না পাওয়ায় লাভের পরিমাণ কমে গেছে। এর ওপর উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে অনেক ভুট্টাখেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও গাছ মাটিতে পড়ে যাওয়ায় ফলনও কমেছে। ফলে বাড়তি খরচের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগও কৃষকদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে।
কৃষকেরা জানান, চলতি মৌসুমে সময়মতো সার ও ডিজেল পাওয়া যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে বেশি দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে হয়েছে। এতে সেচ ও পরিচর্যায় সমস্যা হয়েছে। তাদের আশা ছিল, এবার প্রতিকেজি ভুট্টা ৩১ থেকে ৩২ টাকা দরে বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু বাজার পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশা পূরণ করেনি।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা নদীর চর গড্ডিমারী এলাকার কৃষক শামসুল আলম এবার ২২ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছেন। গত বছর তিনি ২০ বিঘা জমিতে আবাদ করেছিলেন। তিনি জানান, এবারও প্রতি বিঘায় প্রায় ৩৭ মণ ফলন পেয়েছেন।
শামসুল আলম বলেন, ‘গত বছর এক বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষে খরচ হয়েছিল ১৭ হাজার ৫০০ টাকা। এবার সেই খরচ বেড়ে প্রায় ২০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। সার, ডিজেল ও শ্রমিকের পেছনে অতিরিক্ত টাকা খরচ হয়েছে। অথচ এখন ভুট্টা বিক্রি করতে হচ্ছে আগের বছরের তুলনায় কম দামে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভুট্টা চরাঞ্চলের কৃষকের প্রধান অর্থকরী ফসল। অন্য ফসলে যে ঘাটতি থাকে, ভুট্টা সেই ঘাটতি পূরণ করে। কিন্তু এবার দাম কম হওয়ায় লাভ অনেক কমে গেছে।’
রংপুরের মহিপুর তিস্তার চর এলাকার কৃষক সেনা মিয়া বলেন, কালবৈশাখী ঝড়ে তার দুই বিঘা জমির ভুট্টা নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে তিনি মাত্র ২৮ মণ ফলন পেয়েছেন, যেখানে স্বাভাবিক জমিতে বিঘাপ্রতি ফলন হয়েছে প্রায় ৩৮ মণ। তিনি বলেন, ‘এবার ভুট্টা চাষে আগের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়েছে। সময়মতো সার ও ডিজেল পাওয়া যায়নি। এখন আবার বাজারে দামও কম, তাই লাভ কমে গেছে।’
কালীগঞ্জের কাকিনা রুদ্রেশ্বর চরের কৃষক ফজর আলী বলেন, ‘এবার সারের দাম বেশি, তেলের দাম বেশি। প্রতি বিঘায় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা বেশি খরচ হয়েছে। কিন্তু বাজারে দাম কম থাকায় ছয় মাসের পরিশ্রমের পরও তেমন লাভ হচ্ছে না।’ ভুট্টা ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় এ বছর দাম কিছুটা কমেছে।
কাকিনা চাপারতল এলাকার ব্যবসায়ী আশরাফুল হক বলেন, ‘গত বছরের ভুট্টা এখনো গুদামে রয়েছে। ফিড মিলগুলো আগের মতো ভুট্টা কিনছে না। তাই কৃষকদের কাছ থেকে ২৭ থেকে ২৮ টাকা কেজি দরে কিনতে হচ্ছে। সামনে চাহিদা বাড়লে দাম বাড়তে পারে।’ পাটগ্রামের বাউড়া এলাকার ব্যবসায়ী নিবারুন চন্দ্র সেন জানান, তার গুদামে প্রায় ১০ লাখ কেজি ভুট্টা মজুত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘গত বছর ফিড কোম্পানিগুলো যেভাবে ভুট্টা কিনেছিল, এবার তেমন হচ্ছে না। বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমেছে।’
বাউড়া এলাকার একটি ভুট্টা ক্রয়কেন্দ্রের ম্যানেজার দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাজারে এখনো আগের বছরের ভুট্টা মজুত রয়েছে। তবে সামনে চাহিদা বাড়লে দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে দেশে ৬ লাখ ৬৬ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭০ লাখ ৭৯ হাজার টন। গত অর্থবছরে ৬ লাখ ৭৮ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টার উৎপাদন হয়েছিল ৭৩ লাখ ৯৯ হাজার টন।
রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলাÑ লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধায় এবার ১ লাখ ২৭ হাজার ২৩০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ লাখ ২৮ হাজার ৯০০ টন।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘রংপুর অঞ্চলের প্রায় ৯০ শতাংশ ভুট্টা উৎপাদন হয় তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমারসহ বিভিন্ন নদ-নদীর চরাঞ্চলে। ভুট্টা এখন চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভুট্টার মোচা বিক্রি করেও কৃষকেরা বাড়তি আয় করছেন। বাজারদর কিছুটা কম হলেও ভবিষ্যতে চাহিদা বাড়লে কৃষকেরা ভালো দাম পাবেন বলে আশা করছি।’

