ঢাকা বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬

বরগুনার তালতলী

বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষে বিপন্ন গ্রাম

হাইরাজ মাঝি, তালতলী
প্রকাশিত: জুন ২৪, ২০২৬, ০৬:৫৫ এএম

‘মোগো প্রেত্যেকের শইল্লে চুলকানি। খাউজাইতে খাউজাইতে ক্ষ্যাত হইয়া যাইতেছে। জ্বালাপোড়ায় আর বাঁচতে পারতেছি না। এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটা হওয়ার পর থেইক্কা এই সমস্যা। চুলকানিতে আমাগো মাইয়াগো চেহারা নষ্ট হই যায়। এ কারণে এহন এই গ্রামের মাইয়াগোরে কেউ বিয়াও করতে চায় না। শুধু খাউজানি চুলকানি না। কদিন পর পর আমাগো ডায়রিয়া অয়। আরও কত সমস্যা যে মোগো জীবনসঙ্গী হইয়া গেছে বলে শেষ করা যাইত না।’

কথাগুলো বলেছিলেন বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়ী ইউনিয়নের বড় অংকুজানপাড়া এলাকার নারীরা। এসব নারী গত শনিবার বিকেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রসংলগ্ন নতুনপাড়া এলাকায় পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’, ‘মিশন গ্রিন বাংলাদেশ’ এবং ‘পায়রা নদী ইলিশ রক্ষা কমিটি’র আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক উঠান বৈঠকে অংশ নেন। ওই বৈঠকে অংশ নেওয়া ২১ জন নারীর মধ্যে ১৭ জনই বর্তমানে তীব্র চর্মরোগ ও অ্যালার্জিতে আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন।

নিশানবাড়ী ইউনিয়নের বড় অংকুজানপাড়া বর্তমানে এক ‘অভিশপ্ত জনপদে’ পরিণত হয়েছে। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্গত ধোঁয়া আর দূষিত পানিতে এখানকার বাতাস ও প্রকৃতি এখন বিষাক্ত। পরিবেশদূষণের এই নীরব ঘাতক শুধু গাছপালা আর নদীকেই ধ্বংস করছে না, বরং হানা দিচ্ছে মানুষের শরীরেও। সম্প্রতি আয়োজিত উঠান বৈঠকে বেরিয়ে এসেছে এমন ভয়াবহ চিত্র। সেখানেই স্থানীয় নারীরা তাদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের করুণ বয়ান তুলে ধরেন।

জানা যায়, তালতলীর বড় অংকুজান পাড়ায় অবস্থিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ‘বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড’ (বিইপিসিএল) নামে পরিচিত। এটি একটি ৩০৭ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠান আইসোটেক গ্রুপ এবং চীনের শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল সংস্থা পাওয়ার চায়না রিসোর্স লিমিটেড যৌথভাবে বিনিয়োগ করে। প্রকল্পটি নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এটি বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে। স্থানীয় পর্যায়ে এটি মূলত ‘তালতলী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র’ বা ‘আইসোটেক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র’ হিসেবেই বেশি পরিচিতি লাভ করেছে।

ওই বৈঠকে উপস্থিত ভুক্তভোগী নারীরা অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর পর থেকেই তাদের স্বাভাবিক জীবন থমকে গেছে। বাতাসে ভেসে আসা বিষাক্ত ধোঁয়া আর ছাইয়ের কারণে ঘরে ঘরে এখন চুলকানি, অ্যালার্জি, শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ার মতো অসুখ নিত্যসঙ্গী। অর্থাভাবে অনেক পরিবার চিকিৎসা করাতে পারছে না, ফলে রোগ নিয়ে ধুঁকছেন অসহায় নারীরা।

শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের গরম পানি ও নির্গত বর্জ্য পায়রা নদীর জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। স্থানীয় জেলেরা জানান, নদীতে মাছের আকাল দেখা দিয়েছে, ফলে বেকার হয়ে পড়েছে বহু জেলে। এ ছাড়া টেংরাগিরি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য ও আশপাশের কৃষিজমি আজ অস্তিত্ব সংকটে।

পরিবেশ ও জলবায়ু সাংবাদিক এবং মিশন গ্রিন বাংলাদেশের পরিচালক কেফায়েত শাকিল বলেন, ‘উন্নয়নের নামে পরিবেশের অধিকার ও মানুষের মৌলিক নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া অগ্রহণযোগ্য। পরিবেশ আইন অমান্য করে চলা এই দূষণ বন্ধে কর্তৃপক্ষের কঠোর হওয়া প্রয়োজন।’

বৈঠকে বিশেষ অতিথি আরিফ রহমান অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিবেশগত মানদ- অনুসরণ করছে না। অন্যদিকে মো. মোস্তাফিজ বলেন, কয়লা পোড়ানো ধোঁয়া আর বর্জ্যরে দূষণে পায়রা নদীর মৎস্যসম্পদ এবং টেংরাগিরি এলাকার জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।

ভুক্তভোগীদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার এখনো তাদের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন পায়নি। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে কয়লাভিত্তিক প্রকল্প পুনর্বিবেচনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগের দাবি জানানো হয়েছে।

এসব বিষয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।