চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার চৌরাঙ্গী বাজারে সরকারি খাল দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে ৩১টি অবৈধ দোকান। এর ফলে খালটি সংকুচিত হওয়ায় কৃষিক্ষেত্রে স্বাভাবিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রভাব খাটিয়ে খালের জায়গা দখল ও দোকান নির্মাণের ঘটনায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, উপজেলার পাইকপাড়া (উত্তর) ও দক্ষিণ ইউনিয়নের মধ্যবর্তী চৌরাঙ্গী বাজারের মূল সড়কের পাশ দিয়ে প্রবাহিত খালটির ওপর প্রভাবশালীরা গত দুই যুগ ধরে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। স্থানীয় ১৩ ব্যক্তির নেতৃত্বে এই দখলবাজি চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে দখলদারির অভিযোগ রয়েছে, তাদের মধ্যে প্রয়াত চেয়ারম্যান মহসিন পাটওয়ারী, মহিন উদ্দিন, মনির মোল্লা, ইমান মোল্লা, বিএনপি নেতা শাহীন মোল্লা, জয়নাল মিজি, শহীদ মোল্লা, বাবুল মোল্লাসহ আরও কয়েকজন উল্লেখযোগ্য।
দখলদারদের দাবি, তারা সরকারি জায়গা লিজ নিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। তবে বাস্তবে কোনো লিজ গ্রহণ বা বৈধতার প্রমাণপত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন তারা। বরং দখলদারদের একাংশ অর্থের বিনিময়ে প্রভাবশালীদের মাধ্যমে কাগজপত্রের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছেন।
ভুক্তভোগী কৃষক রহমত উল্লাহ (৬০) বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেকে এই খাল দিয়ে আমাদের ফসলের খেতে পানি আসত। এখন তো খাল বলে আর কিছু নাই, প্রভাবশালীরা দোকান বানাইয়া খালটারে মইরা ফেলা দিছে। ড্রেনটাও বন্ধ হইয়া গেছে, বৃষ্টির পানিও ঠিকমতো সরতে পারে না। ধান লাগানোর সময় পানি পাই না, আবার বর্ষায় জমিতে পানি জমে ফসল পচে যায়। প্রভাবশালীদের কাছে আমরা জিম্মি, তারা প্রভাবশালী বইলা কি সরকারি খাল দখল কইরা দোকান বানাবো? আমরা গরিব মানুষ, আমাদের কথা শোনার কেউ নাই। সরকার যদি দ্রুত এই খাল উদ্ধার না করে, তবে আমাদের না খাইয়া মরা ছাড়া উপায় থাকবে না।’
বাবুল ইলেকট্রনিক্সের স্বত্বাধিকারী বাবুল মোল্লা জানান, সম্প্রতি কাগজপত্র ঠিক করে দেওয়ার জন্য মহসিন পাটওয়ারীর ছেলে পাভেল পাটওয়ারীর কাছে ১০ হাজার টাকা দিয়েছি। তিনিই সব জানেন।
ব্যারিস্টার ফজলে মওলা বিন মহসীন (পাভেল) পাটওয়ারীর কাছে বৈধ কাগজপত্রে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘বর্তমানে আমাদের লিজের কোনো প্রমাণপত্র নেই, তবে আমরা লিজ পাব।’ ১০ হাজার টাকা দোকানপ্রতি তোলার বিষয়ে জানান, ‘লিজ নিয়ে দেওয়ার বিষয়টি সঠিক নয়। খাল খননের জন্য সম্মিলিতভাবে একটা টাকা তোলা হয়েছে।’
আরেক দোকান-মালিক বুলু মাস্টার বলেন, ‘আমার কাগজপত্রের মেয়াদ শেষ হয়েছে। তারা আমার কাছে কাগজপত্র ঠিক করার কথা বলে ৫ হাজার টাকা চেয়েছিল, কিন্তু আমি দেইনি। আমি তাদের বলেছি, সরকার চাইলে উচ্ছেদ করুক, আমি আর টাকা দেব না।’
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সম্পত্তি দখলের ফলে খালের পানিপ্রবাহ স্থবির হয়ে পড়েছে, যার মাশুল গুনছেন শত শত কৃষক। কৃষকদের দাবি, দ্রুত এই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে খালটি খনন করা হোক এবং দখলদারদের আইনের আওতায় আনা হোক।
এ বিষয়ে চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রকৌশলী মো. জহুরুল ইসলাম জানান, ‘খালের অংশ লিজ দেওয়ার কোনো সুযোগই নেই। আমরা এরই মধ্যে অবৈধ স্থাপনাগুলোর একটি তালিকা তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠিয়েছি। অনুমোদন পেলে উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেটু কুমার বড়ুয়া বলেন, ‘সরকারি খালের জমি লিজ দেওয়ার আইন নেই। কৃষকের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে এবং সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত উচ্ছেদ নোটিশ প্রদান করা হবে।

