টানা কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টিতে নওগাঁর অন্যতম সবজি উৎপাদনকারী উপজেলা বদলগাছীতে মাঠের পর মাঠ সবজির খেত পানিতে তলিয়ে গেছে। মরিচ, বেগুন, পটোল, ঢ্যাঁড়শ, করলা, তরই, কচুর লতিসহ বিভিন্ন মৌসুমি সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে প্রায় ১ হাজার কৃষক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে মরিচসহ প্রায় সব ধরনের সবজির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন সবজির দাম প্রতি কেজি ২০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আরও বৃষ্টির পূর্বাভাসে কৃষক ও ভোক্তাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কৃষকদের আশঙ্কা, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে এবং বাজারে সবজির সংকট তীব্র হতে পারে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, টানা বর্ষণে উপজেলার আটটি ইউনিয়নের অন্তত ৪৫ হেক্টর সবজির জমি পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে। নিচু জমিতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় অনেক খেতের গাছ পচতে শুরু করেছে। ফলে চলতি মৌসুমে সবজি উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা। গতকাল শনিবার সকালে বদলগাছীর সাপ্তাহিক হাট ঘুরে দেখা যায়, আগের তুলনায় বাজারে সবজির সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর প্রভাবে খুচরা বাজারে কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১৬০ টাকায়। পাইকারি বাজারে বেগুন ৮০ টাকা, করলা ৬০ টাকা, কচুর লতি ৫০ টাকা, তরই ৩০ টাকা এবং পটোল ২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, উৎপাদন কমে যাওয়ায় পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। পরে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যোগ হয়ে খুচরা বাজারে প্রতি কেজিতে আরও ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়ে যাচ্ছে।
বালুভরা ইউনিয়নের কৃষক মো. কামরুল হাসান তুষার বলেন, ‘আট বিঘা জমিতে প্রায় ৫ হাজার পেঁপেগাছ লাগিয়েছিলাম। গত সপ্তাহের ভারি বৃষ্টিতে প্রায় তিন হাজার গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে প্রায় দেড় লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।’
আধাইপুর ইউনিয়নের কৃষক মোহাম্মদ হাসান জানান, পাঁচ কাঠা জমিতে পটোল চাষে প্রায় ৬ হাজার টাকা ব্যয় করেছিলেন। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে গাছ পচে যাওয়ায় এক মণ পটোলও বিক্রি করতে পারেননি।
সদর ইউনিয়নের কৃষক নূর ইসলাম বলেন, ‘১০ কাঠা জমিতে মরিচ চাষ করেছিলাম। গাছে প্রচুর ফুল এসেছিল, ভালো ফলনের আশা ছিল। কিন্তু বৃষ্টির পানিতে পুরো খেত তলিয়ে যাওয়ায় বড় ক্ষতির মুখে পড়েছি।’ স্থানীয় সবজি ব্যবসায়ী লিটন হোসেন বলেন, মাঠ থেকে সবজির সরবরাহ কমে গেছে। চাহিদা স্বাভাবিক থাকলেও সরবরাহ কম থাকায় দাম বাড়ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাবাব ফারহান বলেন, টানা বৃষ্টিতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সবজির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে দ্রুত পুনরায় আবাদ শুরু করা যায়।
সবজি উৎপাদনের জন্য পরিচিত বদলগাছী উপজেলা থেকে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রতি বছর প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন সবজি দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, বর্তমান ক্ষতির প্রভাব শুধু কৃষকের আয়েই নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সবজির সরবরাহ ও বাজারমূল্যেও পড়তে পারে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে উৎপাদন আরও কমে গিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজির দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

