বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো শহিদ জোবায়ের আহমেদের চলে যাওয়ার এক বছর পেরিয়ে গেছে। তবুও শোকের কালো ছায়া আজও ঘিরে আছে তার পরিবারকে। মা নুরজাহান মাঝে মাঝেই মনে করেন, ছেলের পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন, আবার কখনো কানে ভেসে আসে ডাক ‘আম্মা-আম্মা।’ বুধবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এসব পুরোনো কাপড় হাতে নিলে মনে হয় আমার পুতটা এখনো আছে। এসবেই তার ঘ্রাণ মিশে আছে।’
প্রতিবেদককে একটি ছবি দেখিয়ে আবেগে ভেঙে পড়েন নুরজাহান। বলেন, ‘এই যে ছবিটা, জোর করে আমার ছেলে আমাকে জড়িয়ে ধরে তুলেছিল। আমি তখন ধমক দিয়েছিলাম, এসব ছবি-টবির দরকার নেই। আজ সেই ছবিই আছে, আমার পুত নাই।’
গত বছরের ২০ জুলাই গৌরীপুরের কলতাপাড়া বাজারে কারফিউ ভেঙে ছাত্র-জনতা বিক্ষোভ করলে পুলিশ অতর্কিত গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই শহিদ হন জোবায়ের আহমেদসহ তিনজন। মইলাকান্দা ইউনিয়নের কাউরাট গ্রামের এই তরুণ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম।
মা নুরজাহান কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘সেদিন সকালে মাছের তরকারি দিয়ে খাইয়ে দিয়েছিলাম। দোকানে যেতে বারবার বারণ করেছি। কিন্তু বেলা ১১টার দিকেই দোকানের চাবি নিয়ে বের হয়। কিছুক্ষণ পরেই শুনি, আমার ছেলেটা গুলিবিদ্ধ! বিকেলে লাল সাইরেন বাজিয়ে ছেলের লাশ এলো বাসায়।’
বাবা আনোয়ার উদ্দিন সেই দিনের কথা স্মরণ করতে গিয়ে বলেন, ‘যে সন্তানকে মাথায় তুলে বড় করেছি, সেই সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়েছি। নিজের সন্তানের জানাজা পড়েছি, কবরেও শুইয়েছি।’
শুধু সংসারের নয়, স্থানীয় সমাজেরও ভরসা ছিলেন জোবায়ের। পুরোনো মোবাইল কেনাবেচা দিয়ে শুরু করে একসময় বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ আমদানি ও রপ্তানি করতেন। শতাধিক যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। বাবা আক্ষেপ করে বলেন, ‘জোবায়ের বেঁচে থাকলে আজ কোটি টাকা আয় করত। মোবাইল সফটওয়্যারিং ও উৎপাদনের পরিকল্পনা ছিল। সবই স্বপ্ন হয়ে গেল।’
বন্ধু ও প্রতিবেশীদের স্মৃতিতেও ভেসে ওঠে জোবায়েরের হাসি, তার সাহস ও বিনয়। তিনি ছোটদের খেলাধুলায় উদ্বুদ্ধ করতেন, ফুটবল কিনে দিতেন। বন্ধুদের কাছে তার অনুপস্থিতি আজও অপূরণীয় শূন্যতা।
পুত্রকে হারানোর বেদনা লাঘবের চেষ্টায় আনোয়ার উদ্দিন নিজের জমি দান করেছেন ছেলের নামে। সেখানে একটি মক্তব নির্মাণের উদ্যোগ চলছে। এলাকাবাসীরও দাবি, মরাখলা থেকে লাউগাইগামী সড়কের নাম দেওয়া হোক ‘শহিদ জোবায়ের সড়ক’ এবং দ্রুত সেটি পাকাকরণ করা হোক।