লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় সরকারি নথিভুক্ত রাস্তা কেটে পুকুর করেছেন মহেন্দ্রনাথ রায় নামে এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। এতে অবরুদ্ধ হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে ছয়টি পরিবার।
অভিযোগে জানা গেছে, উপজেলার সারপুকুর ইউনিয়নের টিপের বাজার এলাকার প্রভাবশালী মহেন্দ্রনাথ রায় প্রায় তিন বছর আগে সরকারি নথিভুক্ত একটি রাস্তা কেটে একটি বড় পুকুর খনন করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ থেকেই এই রাস্তা ব্যবহার করে কয়েকটি ইউনিয়নের বাসিন্দারা সাপ্টিবাড়ির বিড়ানি হয়ে লালমনিরহাট শহরে যাতায়াত করতেন। সেই জনবহুল রাস্তাটির একটি অংশ বিলীন করে ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুরে পরিণত করা হয়েছে। যদিও রাস্তার কিছু অংশ এখনো সরকারি নথিভুক্ত রয়েছে, বাস্তবে সেখানে প্রভাবশালীর পুকুর রয়েছে।
প্রথম দিকে স্থানীয়দের যাতায়াতের জন্য পুকুরের পাশ দিয়ে একটি রাস্তা করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সেই রাস্তাটিও পুকুরে ভেঙে নেওয়া হয়। এরপর ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে যাতায়াতের জন্য একটি সরু পথ দেওয়া হয়। দুই বছর আগে মহেন্দ্রনাথ তার মালিকানাধীন মাত্র তিন হাত প্রস্থের সেই পথও বন্ধ করে দিলে এলাকার ছয়টি পরিবার পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের একজন সুকুমার রায় বাদী হয়ে দুই বছর আগে আদিতমারী থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে যাতায়াতের রাস্তা খুলে দেয়। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই মহেন্দ্রনাথের ছেলে মদন মোহন আবারও রাস্তা বন্ধ করে দেন। এরপর থেকে ছয়টি পরিবারের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মাত্র তিন হাত প্রস্থের এ রাস্তায় গর্ত করে কাটা ও জিআই তার দিয়ে চলাচল বন্ধ করা হয়েছে।
বাধ্য হয়ে সেখানকার বিশ্বনাথ ও সুনীল চন্দ্র ঘরবাড়ি ছেড়ে সন্তানদের নিয়ে অন্যত্র বসবাস শুরু করেন। বাকি চারটি পরিবার জমির আইল ও বাঁশবাগানের আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে ঘুরে যাতায়াত করছেন। বর্ষা মৌসুমে তাদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। শিশুদের স্কুলে যাতায়াত, রোগী পরিবহন, এমনকি ফায়ার সার্ভিস বা লাশ বহনেরও কোনো সুযোগ নেই এই ছয় পরিবারের। দেড় বছর আগে জীতেন্দ্রনাথের মা শীতবালা মারা যান। বহু অনুরোধ করেও তার লাশ নেওয়ার জন্য রাস্তা দেওয়া হয়নি।
অবরুদ্ধদের একজন বৃদ্ধা কৃষ্ণাবালা বলেন, ‘রাস্তা না থাকায় এক বছর ধরে ছেলে বাড়িতে আসে না। নাটোর থেকে পাশের গ্রামে এসে দেখা করে চলে যায়। মনে হয় বাংলাদেশের ভেতরেই আমরা ভিনদেশি। পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়া যেন যাওয়া যাবে না। লাশও শ্মশানে নিতে পারি না।’
অবরুদ্ধ বাসন্তী রানী বলেন, ‘মা শীতবালা দেড় বছর আগে মারা যায়। লাশ নেওয়ার জন্য মহেন্দ্রনাথের পা ধরেও রাস্তা পাইনি। শেষে ফসলের খেতের ওপর দিয়ে লাশ শ্মশানে নিতে হয়েছে।’
অবরুদ্ধ সুকুমার রায় বলেন, ‘দুই বছর ধরে আমরা অবরুদ্ধ। সমাজের লোকজন বহুবার বসেছে, কিন্তু কোনোভাবে রাস্তা পাইনি। থানায় অভিযোগ দিলে পুলিশ এসে রাস্তা খুলে দেয়, কিন্তু দুই দিন পর আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়। নিরুপায় হয়ে এখন খেতের আইল দিয়ে যাতায়াত করছি। রাস্তার অভাবে আমাদের ছয় পরিবারে বিয়ে-শাদিও হচ্ছে না।’
স্থানীয় কলেজছাত্র আতিয়ার রহমান রাজু বলেন, ‘গ্রামবাসী বহুবার অনুরোধ করেছে, কিন্তু মহেন্দ্রনাথ মাত্র তিন হাত চওড়া রাস্তাটুকু দিতেও রাজি হননি। অথচ তিনি সরকারি নথিভুক্ত প্রায় ৪০–৫০ হাত রাস্তা কেটে পুকুর করেছেন। অবরুদ্ধ ছয় পরিবারের যোগাযোগ স্বাভাবিক করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’
পল্লি চিকিৎসক ইউসুফ আলী বলেন, ‘আমার বাড়ি কাকিনায় হলেও এখানে আমার চাষাবাদের জমি আছে। আগে এই রাস্তা দিয়েই গরুর গাড়িতে ধান আনা-নেওয়া করতাম। দুই বছর আগে রাস্তা কেটে পুকুর করায় এখন আর যাতায়াতের পথ নেই। সরকারি রাস্তা দখল করে অন্যদের অবরুদ্ধ করা হয়েছে। বেদখল হওয়া সরকারি রাস্তা উদ্ধারের দাবি জানাই।’
অভিযুক্ত মহেন্দ্রনাথ রায় ও তার ছেলে মদন মোহন বলেন, ‘কেউ চলাচল না করায় আমরা আমাদের জমির ওপরের রাস্তা কেটে পুকুর করেছি। সরকার পারলে তাদের রাস্তা উদ্ধার করুক। আমাদের ব্যক্তিগত জমিতে কাউকে চলাচল করতে দেব না, জেল-জরিমানা হলেও রাস্তা দেব না। কার যা করার আছে করুক।’
সারপুকুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মাইদুল ইসলাম মুকুল বলেন, ‘চেয়ারম্যানসহ গ্রামবাসী একাধিকবার বৈঠক করেছি, কিন্তু মহেন্দ্রনাথ রাস্তা দিতে রাজি হননি। আমরা ব্যর্থ হয়েছি। রাস্তা না থাকায় ছয়টি পরিবার চরম কষ্টে আছে। দ্রুত রাস্তার ব্যবস্থা করতে ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিধান কান্তি হালদার বলেন, ‘সরকারি নথিভুক্ত রাস্তা বেদখলের কোনো সুযোগ নেই। সার্ভে করে দ্রুত রাস্তা উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে অবরুদ্ধ ছয় পরিবারকেও মুক্ত করা হবে। কেউ দখল করে থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন