ঠাকুরগাঁও জেলাবাসীর স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করে জেনারেল হাসপাতালের কার্যক্রম চালু করা হয়। কিন্তু শয্যা বাড়লেও বাড়েনি জনবল। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা না করায় হাসপাতালটি এখন তেলাপোকার প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। হাসপাতালের মেঝে, ওয়াল, রোগীর খাবার ও ওষুধ রাখার বাক্স—সর্বত্র তেলাপোকার অবাধ বিচরণে অতিষ্ঠ রোগীরা। খাবার, কাপড়-চোপড়সহ শরীরের ওপর দিয়ে অবাধে হাঁটাচলা করায় অনেক রোগীকে নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে।
এক সময়ের আধুনিক সদর হাসপাতাল এখন ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতাল। রোগীদের অতিরিক্ত চাপ সামলাতে ও আসনসংকট নিরসনে ২০১৬ সালে ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে গণপূর্ত বিভাগের আওতায় ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের ৭ তলা বিশিষ্ট নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে ১০০ শয্যা বিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে রূপান্তর করে নতুন ভবনে চিকিৎসাসেবা শুরু করা হয়।
এখানে ২৫০ শয্যার বিপরীতে বেশিরভাগ সময়ে ৬/৭শ রোগী ভর্তি থাকে। এসব রোগী ও তাদের অ্যাটেনডেন্টদের ভিড়ে হাসপাতালটি সবসময় গিজগিজ করে। ঠাকুরগাঁও জেলা ছাড়াও পাশ্ববর্তী পঞ্চগড়, দিনাজপুর ও নীলফামারী জেলার অনেক রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য এ হাসপাতালে ছুটে আসায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বহিরাগত হাজার হাজার মানুষের বিভিন্ন ধরনের খাবার ব্যবহার এবং যত্রতত্র খাবার পড়ে থাকায় তেলাপোকা জন্ম নিচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের মেডিসিন ও সার্জারি ওয়ার্ড আসন সংখ্যার চেয়ে অতিরিক্ত রোগী ও তাদের স্বজনদের ভিড়ে ঠাসা থাকে। জনবল সংকটের কারণে জনসমাগম অনুযায়ী ওয়ার্ড দুটি নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় না। এ কারণে এই দুটি ওয়ার্ডে তেলাপোকা বাসা বেঁধেছে। রোগীর ওষুধপত্র রাখার বাক্স, টেবিল ও বিছানার নিচে হাজার হাজার তেলাপোকা বসবাস করে। একটু ধাক্কা পেলেই বেরিয়ে পড়ে শত শত তেলাপোকা।
এসব তেলাপোকা অবাধে রোগীর ওষুধ, খাবার ও গায়ে হেঁটে বেড়ায়। রাতের আধারে তাদের উপদ্রব বেড়ে যায়। যখন-তখন নাক-কানে কামড় দেওয়ায় বেশিরভাগ রোগী রাতের বেলা ঘুমাতে পারেন না। এ কারণে অনেক রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে অসুস্থই থেকে যান। আবার তেলাপোকার সংস্পর্শে আসা খাবার খেয়ে অনেকে পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন।
রোগীরা অভিযোগ করে বলেন, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা করা হলে এ দুরবস্থা সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তা না করায় ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালটি এখন তেলাপোকার প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সেই সঙ্গে নোংরা টয়লেটগুলো নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না করায় সেগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বৈদ্যুতিক বাল্ব না থাকায় টয়লেটগুলো সবসময় অন্ধকারে থাকে। প্রাকৃতিক কাজ সেরে পানি ব্যবহারের মতো নেই বদনা। টয়লেটের কমোডগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়। সেগুলোতে রোগীদের গজ, ব্যান্ডেজ ও মলমূত্র জমে আছে।
এ ব্যাপারে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহা. ফিরোজ জামান জুয়েল হাসপাতালে জনবল সংকট থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘২৫০ শয্যার ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালে রোগী ভর্তি থাকে ৬/৭শ। হাসপাতালের আসন ও ফ্লোর রোগীতে গিজগিজ করে। রোগী ও তাদের স্বজনরা যত্রতত্র খানাপিনা করেন। হাসপাতালটিকে একসঙ্গে খালি করে পরিপূর্ণভাবে তেলাপোকা মেরে ২/১ দিন রেস্টে রেখে চিকিৎসাসেবা চালু করার সুযোগ নেই। এজন্য আমরা নিয়মিতভাবে ক্রমান্বয়ে বিষ স্প্রে করে আসছি। ২/১ দিন পরপর অভিযান চালাচ্ছি। তারপর ২/১ দিন পর আবার হাজির হয়। তারপরও আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, এত সংখ্যক রোগীর সেবা প্রদানের জন্য যে পরিমাণ জনবল দরকার, সে পরিমাণ জনবল এখানে নেই। পদ সৃষ্টি ও জনবল নিয়োগ দেওয়া গেলে কিছুটা সমস্যা দূর করা যাবে। সেই সঙ্গে হাসপাতালে তেলাপোকা নিধনের জন্য স্প্রে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। খুব শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অপরদিকে, টয়লেটের দুরবস্থার বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক বলেন, যেখানে শয্যার চেয়ে অনেক বেশি রোগী ও তাদের অ্যাটেনডেন্টরা থাকেন এবং পর্যাপ্ত পানি ব্যবহার না করায় তা দ্রুত ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বহিরাগতদের টয়লেট ব্যবহারে আচরণগত ভিন্নতার কারণেও নোংরা অবস্থার সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। এটি ঠিক রাখা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি রোগী ও তাদের স্বজনদেরও সচেতন হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন