কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলায় বোরো ধান চাষে একের পর এক সংকটে পড়ে দিশেহারা হয়ে উঠেছেন কৃষকেরা। সারের দাম বৃদ্ধির ধাক্কা কাটতে না কাটতেই এবার ডিজেল সংকট নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে। ভরা মৌসুমে সেচের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল না পেয়ে কিংবা অতিরিক্ত দামে কিনতে গিয়ে উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ফলে কৃষকদের চোখে-মুখে এখন অনিশ্চয়তা ও হতাশা।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকেরা জমিতে সেচ দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেকেই নিরুপায় হয়ে গ্রামের খুচরা দোকান কিংবা দালালদের কাছ থেকে বোতলে করে অল্প পরিমাণ ডিজেল কিনছেন। সেখানে প্রতি লিটারে ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে। তবুও প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না।
দামিহা ইউনিয়নের কাজলা গ্রামের কৃষক মাজেদুল হক বলেন, সারের দাম আগেই বেড়েছে। এখন আবার ডিজেল ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। যা পাওয়া যায়, তাও বেশি দামে কিনতে হয়। এই অবস্থায় চাষ করে লাভ তো দূরের কথা, খরচই তোলা কঠিন হয়ে গেছে।
উপজেলার তালজাঙ্গা ইউনিয়নের আড়াইউড়া গ্রামের সাকিব মিয়া, অজিত তালুকদারসহ কয়েকজন কৃষক জানান, এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে কমপক্ষে ৫০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়, কোথাও কোথাও আরও বেশি লাগে। জমিতে প্রায় তিন মাস নিয়মিত সেচ দিতে হয়। বর্তমান বাজারদরে বিঘাপ্রতি সেচ খরচ দাঁড়াচ্ছে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা।
তবে খোলা বাজার থেকে অতিরিক্ত দামে ডিজেল কিনলে সেই খরচ বেড়ে ৮ থেকে ৯ হাজার টাকায় পৌঁছাচ্ছে। তারা আরও জানান, শুধু সেচ নয়—সার, কীটনাশক, আগাছা পরিষ্কার, শ্রমিকের মজুরি ও জমি প্রস্তুতসহ সব মিলিয়ে এক বিঘা জমিতে ধান উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রায় ২০ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, বিঘাপ্রতি গড়ে ২২ থেকে ২৩ মণ ধান উৎপাদন হলেও বিভিন্ন খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ২০ মণ ধান বিক্রির উপযোগী থাকে। বর্তমান বাজারে প্রতি মণ ধানের দাম ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকার মধ্যে থাকায় মোট আয় দাঁড়ায় প্রায় ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ খড় ছাড়া কার্যত কোনো লাভ থাকছে না কৃষকদের।
তাড়াইল-সাচাইল সদর ইউনিয়নের কালনা গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, এখন ধান চাষ করা মানে নিজের পকেট থেকে টাকা ঢালা। এত কষ্ট করে ফসল ফলিয়ে যদি লাভই না হয়, তাহলে সামনে চাষ করব কীভাবে?
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারিভাবে ডিজেল সরবরাহ ও বাজার তদারকি কার্যকর না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত দামে ডিজেল কিনছেন। তাদের দাবি, দ্রুত ডিজেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা না হলে কৃষকেরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিকাশ রায় জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ হাজার ৩৬৫ হেক্টর। ইতোমধ্যে ১০ হাজার ৪২০ হেক্টর জমিতে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমিতে ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভর করতে হয়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে হাওড় এলাকায় ধান দানা পর্যায়ে রয়েছে এবং নন-হাওড় এলাকায় থোড় অবস্থায় আছে। সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের কারণে আপাতত সেচের প্রয়োজন কিছুটা কমেছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে কৃষকেরা আবারও সমস্যায় পড়তে পারেন।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন খরচ ও বাজারমূল্যের এই বৈষম্য অব্যাহত থাকলে কৃষকদের আগ্রহ কমে যেতে পারে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এমন বাস্তবতায় তাড়াইলের কৃষকেরা এখন তাকিয়ে আছেন কার্যকর পদক্ষেপের দিকে—যাতে ন্যায্য দামে সার ও জ্বালানি নিশ্চিত হয় এবং তাদের ঘামঝরা পরিশ্রম অন্তত ন্যূনতম লাভে পরিণত হয়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন