× UCB Sticker Card
বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: জুলাই ২২, ২০২৬, ০১:০৭ পিএম

বাঙালি নদীর ভয়াল ভাঙনে বিলীন হচ্ছে গ্রাম, অনিশ্চয়তায় নদীপাড়ের মানুষের জীবন

শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: জুলাই ২২, ২০২৬, ০১:০৭ পিএম

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

ক্রমাগত নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে আবাদি জমি, নষ্ট হচ্ছে ফসল, হারিয়ে গেছে অসংখ্য বসতভিটা। অনেক পরিবার চোখের সামনে পৈতৃক ভিটা নদীতে তলিয়ে যেতে দেখেও কিছুই করতে পারেনি। শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে বাধ্য হয়েছে অন্যত্র আশ্রয় নিতে। আবার অনেকেই সবকিছু হারানোর আগেই সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন। চোখের সামনে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে অনেকের সারাজীবনের সঞ্চয়, রেখে যাওয়া শেষ সম্বল আর অসংখ্য স্মৃতির ঠিকানা। 

‎‘এই বয়সে আর কোথায় যাব বাবা? স্বামীর রেখে যাওয়া এই ভিটাতেই সারাজীবন কাটিয়েছি। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে এই উঠোনেই সংসার গড়েছিলাম। এখন যদি এটুকুও নদী নিয়ে যায়, তাহলে শেষ বয়সে রাস্তায় দাঁড়ানো ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না। ভগবান জানেন, আমাদের কপালে কী আছে।’-

‎কথাগুলো বলতে বলতে নদীর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন প্রভাতী রানী। তার বাড়ির অর্ধেকেরও বেশি অংশ ইতোমধ্যে বাঙালি নদীর গর্ভে বিলীন হয়েছে। অবশিষ্ট সামান্য ভিটাটুকুও এখন ভাঙনের মুখে। প্রতিটি বর্ষার রাত তার কাছে একেকটি দুঃস্বপ্ন। কখন নদী গিলে নেবে জীবনের শেষ আশ্রয়টুকু সেই শঙ্কায় দিন-রাত কাটছে তার।

‎প্রভাতী রানীর মতো একই আতঙ্কে দিন কাটছে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার চক খানপুর গ্রামের হাওলাদারপাড়ার শতাধিক মানুষের। একসময় প্রায় ১৩০টি পরিবারের বসবাসে মুখর ছিল বাঙালি নদীর তীরের এই জনপদ। কৃষিকাজ, সংসারের ব্যস্ততা আর পারিবারিক বন্ধনে প্রাণবন্ত ছিল পুরো এলাকা। কিন্তু গত কয়েক বছরের ভয়াবহ নদীভাঙনে সেই জনপদ আজ পরিণত হয়েছে দীর্ঘশ্বাস আর কান্নার গ্রামে।

‎ক্রমাগত নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে আবাদি জমি, নষ্ট হয়েছে ফসল, হারিয়ে গেছে অসংখ্য বসতভিটা। অনেক পরিবার চোখের সামনে পৈতৃক ভিটা নদীতে তলিয়ে যেতে দেখেও কিছুই করতে পারেনি। শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে বাধ্য হয়েছে অন্যত্র আশ্রয় নিতে। আবার অনেকেই সবকিছু হারানোর আগেই সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন। ভাঙতে বসেছে গ্রামের ছোট মন্দিরটিও।

‎বছরের পর বছর ধরে চলা এই নির্মম বাস্তবতায় হাওলাদারপাড়ায় এখন অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র প্রায় ৬০টি পরিবার। এতদিন তাদের একমাত্র ভরসা ছিল, সরকারি উদ্যোগে হয়তো স্থায়ী নদীশাসন বা ভাঙনরোধী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেই আশাতেই তারা পৈতৃক ভিটা আঁকড়ে ছিলেন। কিন্তু চলতি বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি সেই প্রত্যাশা। কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় এবারের বর্ষাতেও নতুন করে ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটছে নদীপাড়ের মানুষের।

‎স্থানীয়দের দাবি, শুধু চলতি বছরেই বাঙালি নদীর তীব্র ভাঙনে প্রায় ২০ থেকে ২৫ ফুট এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন জায়গায় ভাঙন ছড়িয়ে পড়ছে। নদীর কিনারায় থাকা পরিবারগুলো প্রতিটি রাত কাটাচ্ছে উৎকণ্ঠায়। সকালে ঘুম ভেঙে নিজের বাড়িটি অক্ষত অবস্থায় দেখতে পাবেন কি না, সেই নিশ্চয়তাও নেই তাদের।

‎ভুক্তভোগী মংলা চন্দ্র হাওলদার (৫৫) বলেন, ‘চোখের সামনে নদী সব গিলে খাচ্ছে। সারাজীবনের কষ্টে গড়া ঘরটা এখন ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে। দিন-রাত শুধু একটাই ভয়, কখন ঘুম থেকে উঠে দেখব, ঘরটা আর নেই। আমরা গরিব মানুষ, ভিটেমাটি হারালে মাথা গোঁজার আর কোনো ঠাঁই থাকবে না।’

‎উজ্জ্বল সরকার (৩৫) বলেন, নদী থেকে যেভাবে বালু তোলা হয়েছে, তার জন্যই এ বছর ভাঙন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। আমরা চিৎকার করলেও কেউ শুনে না। একদিকে নদী ঘর কেড়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে সংসার চালানোর চিন্তা। মনে হয়, গরিবের কান্নার কোনো দাম নেই।

‎পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন শ্রীমতী সবরী রানী (৪৫)। চোখে ছিল অজানা ভবিষ্যতের ভয়। তিনি বলেন, পাশের বাড়িগুলো একে একে নদীতে চলে যেতে দেখেছি। এখন নিজের বাড়ির পালা। প্রতিদিন বুক ধড়ফড় করে, আজ বুঝি আমাদের ঘরটাও নদীতে মিশে যাবে। সন্তানদের নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেব, সেই উত্তর আমাদের জানা নেই।

‎নদী শুধু ভিটেমাটি কেড়ে নিচ্ছে না; কেড়ে নিচ্ছে মানুষের নিরাপত্তাবোধ, শৈশবের স্মৃতি, পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নও। যাদের সারা জীবনের সঞ্চয় বলতে এক টুকরো বসতভিটা, সেই মানুষগুলোর কাছে নদীভাঙন মানে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, অস্তিত্ব হারানোর ভয়। নদীপাড়ের মানুষের এখন একটাই আকুতি, আর যেন একটি পরিবারও ভিটেমাটি হারিয়ে পথে না বসে। বর্ষার আরও একটি ঢেউ আসার আগেই কার্যকর নদীশাসন ও ভাঙনরোধী ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হোক।

‎এ বিষয়ে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা আমরা খুব দ্রুত পরিদর্শন করব এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজন অনুযায়ী জিও ব্যাগ বা অন্যান্য সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

‎পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবির বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আসন্ন বাজেটে বরাদ্দও চাওয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া মাত্রই দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!