ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত বগুড়ায় দিন যত যাচ্ছে, ততই ঘনীভূত হচ্ছে ভোটের সমীকরণ। দৃশ্যত নির্বাচন দুই দলের বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ থাকলেও বাস্তবে এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও জটিল ও বহুস্তরীয় হিসাব। এই নির্বাচনের ভাগ্য নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী ঘরানার ‘নীরব ভোটব্যাংক’, প্রশাসনিক পরিবেশ এবং ভোটের দিনকার টার্নআউট।
মাঠে কারা এগিয়ে, কারা পিছিয়ে
বর্তমানে বগুড়ার সাতটি আসনের প্রতিটিতেই বিএনপি ও জামায়াত সমানতালে প্রচার চালাচ্ছে। বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও জামায়াতের প্রচার-কৌশল বেশি পরিকল্পিত ও লক্ষ্যভিত্তিক। জামায়াত সামাজিক কর্মকাণ্ড, ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও নিরবচ্ছিন্ন মাঠকর্মের মাধ্যমে ‘নীরব ভোটার’দের কাছে পৌঁছাতে চেষ্টা করছে। বিএনপি নেতারা বলছেন, বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমানের জন্মভূমি এবং খালেদা জিয়া–তারেক রহমানের রাজনৈতিক ঘাঁটি। সুতরাং নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে ফলাফল তাদের পক্ষেই যাবে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এবারের নির্বাচন ঐতিহ্যের চেয়ে বাস্তবতার পরীক্ষাই বেশি।
‘নীরব আওয়ামী ভোট’ সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর
বগুড়ার সাতটি আসনেই আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিকভাবে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ ভোট রয়েছে। দলটি নির্বাচনে সক্রিয় না থাকায় এই ভোট এখন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে। প্রশ্ন হলো এই ভোট যাবে কোথায়? জামায়াত নেতাদের দাবি, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা, হয়রানি ও প্রতিশোধমূলক আচরণের অভিযোগে আওয়ামী ঘরানার ভোটারদের একটি বড় অংশ বিএনপির প্রতি বিরূপ হয়েছে। ফলে তারা প্রকাশ্যে ভোট না দিলেও জামায়াতকে ‘নীরব সমর্থন’ দিতে পারে। অন্যদিকে বিএনপি নেতারা বলছেন, আওয়ামী ভোটাররা জামায়াতকে কখনোই বিশ্বাস করে না; তারা ভোট না দিলেও বিএনপিকে ঠেকাতে সক্রিয় হবে না।
আসনভিত্তিক ঝুঁকি ও সম্ভাবনা
বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি–সোনাতলা): এ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলাম এবং জামায়াত প্রার্থী সাবেক জেলা আমির অধ্যক্ষ শাহবুদ্দিন। বিএনপি সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে থাকলেও জামায়াত আওয়ামী ঘরানার ভোট নিজেদের দিকে টানার ব্যাপারে আশাবাদী। লড়াই জমে উঠলেও ফল নির্ভর করবে শেষ মুহূর্তের ভোটের গতিপ্রবাহের ওপর। এখানে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে শক্ত হলেও জামায়াতের সাবেক জেলা আমির প্রার্থী হওয়ায় ধর্মভিত্তিক ও নীরব ভোটের সমীকরণ বদলে যেতে পারে। ভোটার উপস্থিতি কম হলে ফলাফল অপ্রত্যাশিত হতে পারে।
বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ): বিএনপির মীর শাহে আলম ও জামায়াতের সাবেক এমপি মাওলানা শাহাদাতুজ্জামানের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস। উভয় দলই উঠান বৈঠক, গণসংযোগ ও কর্মী সমাবেশে ব্যস্ত সময় পার করছে। জাতীয় পার্টির প্রার্থী শরিফুল ইসলাম জিন্নাহর নির্বাচন বর্জনের ফলে ভোটের মাঠ কার্যত দ্বিমুখী। এখানে জাপার ভোট কোন দিকে যাবে সেটিই মূল প্রশ্ন। জামায়াত এই ভোট নিজেদের দিকে টানতে মরিয়া।
বগুড়া-৩ (আদমদীঘি–দুপচাঁচিয়া): বিএনপির আবদুল মুহিত তালুকদার দীর্ঘদিন ধরে মাঠে সক্রিয়। জামায়াতের নূর মোহাম্মদ আবু তাহের নীরবে সংগঠন শক্তিশালী করে ভোটের অঙ্ক কষছেন। এই আসনে নীরব ভোট ও সাংগঠনিক শক্তির লড়াই। বিএনপি প্রকাশ্য মাঠে এগিয়ে থাকলেও জামায়াত ভোটের দিনে চমক দিতে পারে।
বগুড়া-৪ (কাহালু–নন্দীগ্রাম): বিএনপির সাবেক এমপি মোশাররফ হোসেন ও জামায়াতের মোস্তফা ফয়সল পারভেজের মধ্যে দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ঐতিহ্যগতভাবে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও জামায়াত সাম্প্রতিক সময়ে ভোট বৃদ্ধির দাবি করছে। এখানে বিএনপি ঐতিহ্যগতভাবে শক্ত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতের ভোট বাড়ার দাবি রয়েছে। ধর্মীয় ও ন্যায়বিচারভিত্তিক প্রচার কতটা কার্যকর হয়, সেটিই নির্ধারক।
বগুড়া-৫ (শেরপুর–ধুনট): সাবেক এমপি গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ (বিএনপি) ও দবিবুর রহমান (জামায়াত) মুখোমুখি। বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী ঘরানার ভোট এখানে ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সবচেয়ে অনিশ্চিত আসনগুলোর একটি। আওয়ামী ঘরানার ভোট এখানে ফলাফল উল্টে দিতে পারে। দুই দলই এখানে ‘সফট ভোটার’দের টার্গেট করছে।
বগুড়া-৬ (সদর): ‘ভিভিআইপি’ খ্যাত এই আসনে বিএনপির প্রার্থী তারেক রহমান। অতীতে এখান থেকে খালেদা জিয়া বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। জামায়াতের অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেল নিয়মিত গণসংযোগ ও সামাজিক কার্যক্রম চালিয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলছেন। ভিভিআইপি আসন। তারেক রহমান প্রার্থী হওয়ায় বিএনপির সর্বোচ্চ শক্তি এখানে নিয়োজিত। তবে জামায়াতের ডিজিটাল ও সামাজিক প্রচার বিএনপির জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে।
বগুড়া-৭ (গাবতলী–শাজাহানপুর): শহীদ জিয়ার জন্মভূমি হিসেবে পরিচিত এই আসনে বিএনপির মোর্শেদ মিলটন ও জামায়াতের গোলাম রব্বানীর লড়াই। এখানেও আওয়ামী ঘরানার ভোট বড় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত। শহীদ জিয়ার জন্মভূমি হওয়ায় বিএনপির আবেগী সুবিধা রয়েছে। তবে জামায়াত এখানে সংগঠিত ভোটের ওপর ভরসা করছে।
ভোটের দিন কী হবে নির্ধারক
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- ভোটার উপস্থিতির হার, নীরব আওয়ামী ভোটের গন্তব্য এবং ভোটের দিন প্রশাসনিক ভূমিকা ও পরিবেশ যদি ভোটার উপস্থিতি কম হয়, তাহলে সংগঠিত ভোটের সুবিধা পাবে জামায়াত। আর উপস্থিতি বেশি হলে বিএনপি এগিয়ে থাকবে। বগুড়ার এবারের নির্বাচন শুধু দলীয় শক্তির লড়াই নয়, এটি এক ধরনের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের পরীক্ষা। প্রকাশ্য মাঠের চেয়ে নীরব ভোট, ভয়-ভরসা আর বাস্তব অভিজ্ঞতাই নির্ধারণ করবে কারা বিজয়ের হাসি হাসবে। সব উত্তর মিলবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের বাক্স খুললেই।

