চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় পদ্মা নদীতে (ভারতীয় অংশে) নৌকাডুবির ঘটনায় গোলকাজুল ওরফে কাজল (৩৫) নামে এক ব্যক্তির নিখোঁজ হন। এ ঘটনায় তদন্ত ছাড়াই অপহরণ মামলা নেওয়ায় সদর মডেল থানার ওসি নুরে আলমকে শোকজ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে এবং তদন্ত ছাড়াই এ মামলা গ্রহণের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সদর মডেল থানার ওসিকে শোকজ করা হয়েছে। মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে কামরুজ্জামান বাচ্চুকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘তদন্তে যদি বাকি আসামিরা নির্দোষ প্রমাণিত হন, তাহলে তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। আর প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে, বৃহস্পতিবার মামলা প্রত্যাহার এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় জনগণ।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা জানান, গত ৩ জানুয়ারি গভীর রাতে চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের নাড়-খাকি এলাকায় পদ্মা নদীতে একটি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। এতে চাকপাড়া গ্রামের বাসিন্দা গোলকাজুল ওরফে কাজল (৩৫) নিখোঁজ হন। ঘটনার পরদিনই নৌকাডুবিতে একজন নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি পুলিশ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় গোলকাজুলের সঙ্গে ছিলেন তার সহযোগী কামরুজ্জামান ওরফে বাচ্চু। তারা একটি ছোট ডিঙ্গি (বাড্ডি) নৌকায় করে গরু আনতে ভারতে যান। পদ্মা নদী পার হওয়ার সময় ঝড়ো বাতাস ও তীব্র স্রোতের মুখে পড়লে নৌকাটি উল্টে যায়। এতে বাচ্চু সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও ভারী কাপড় ও জ্যাকেট পরিহিত অবস্থায় গোলকাজুল পানিতে তলিয়ে যান এবং আর উঠে আসতে পারেননি। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ রয়েছেন।
বক্তারা অভিযোগ করেন, এ নৌকাডুবির ঘটনাকে একটি প্রভাবশালী চক্র, যারা এলাকায় মাদক ব্যবসা ও গরু পাচারসহ নানা অপরাধে জড়িত তারা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে কোনো প্রকার প্রাথমিক ও অধিকতর তদন্ত ছাড়াই একটি অপহরণ মামলা করা হয়েছে।
এতে আটজনকে নামীয় এবং অজ্ঞাত আরও আটজনকে আসামি করা হয়, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও হয়রানিমূলক। তাদের দাবি, মামলাটি প্রভাবশালীদের প্রভাব ও অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে দায়ের করা হয়েছে এবং নির্দোষ মানুষদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ঘটনাস্থলের একমাত্র প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও গোলকাজুলের সহযোগী কামরুজ্জামান বাচ্চুকে বাদ দিয়ে প্রথমে অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। পরে বাদীর করা মামলার প্রেক্ষিতে সন্দেহভাজন হিসেবে বাচ্চুকেও এ মামলায় আসামি করা হয়। এ ছাড়া রাজসাক্ষী বাচ্চুকে থানায় নিয়ে দুই দিন আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তার স্ত্রী সাবানা বেগম।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘একটি প্রভাবশালী চক্র এলাকায় মাদক ব্যবসা ও গরু পাচারসহ নানা অপরাধে জড়িত থেকে বিরোধীদের দমনে মিথ্যা মামলা ব্যবহার করছে, যার পেছনে প্রশাসনের একটি অংশের নীরব ভূমিকা রয়েছে।’
আলাতুলী ইউনিয়নের রাণীনগর গ্রামের বাসিন্দা ও কামরুজ্জামান বাচ্চুর ভাই আনারুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, তার ভাইকে আটক করে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে এবং জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে বাচ্চু বারবার পুলিশকে জানিয়েছেন যে এটি একটি নৌকাডুবির ঘটনা।
চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এই মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তদন্ত ছাড়াই মামলা নিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। মামলার পেছনে কোনো আর্থিক লেনদেন বা প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।’
উল্লেখ্য, গত ৩ জানুয়ারি গভীর রাতে গরু আনতে গিয়ে ভারতের নাড়-খাকি এলাকায় পদ্মা নদীতে নৌকাডুবির ঘটনায় গোলকাজুল ওরফে কাজল নামে একজন নিখোঁজ হন। এখনো তার মরদেহ বা কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ঘটনার সাত দিন পর কাজলের স্ত্রী লিমা বেগম আটজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে সদর মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
এদিকে, তদন্ত ছাড়াই মামলা গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করেছেন সদর মডেল থানার ওসি নুরে আলম। তিনি জানান, বাদীর আবেদনের প্রেক্ষিতেই মামলা গ্রহণ করা হয়েছে এবং প্রাথমিক বা অধিকতর তদন্ত ছাড়াই মামলাটি নেওয়া হয়েছে।
তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ প্রসঙ্গে ওসি বলেন, নির্যাতন, প্রভাবশালীদের চাপ কিংবা অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সঠিক নয়। এসব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন এবং দাবি করেন, মামলা গ্রহণ ও পরবর্তী কার্যক্রম আইন অনুযায়ীই পরিচালিত হচ্ছে।



