ঢাকা সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

পদ্মার তেল চুরির প্রতিবেদন অন্ধকারেই!

মো. গিয়াস উদ্দিন, চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশিত: জুন ২২, ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

গেল মাসে চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দর এলাকায় পদ্মা অয়েল কোম্পানির তেল চুরির ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর নড়েচড়ে বসেছিল সংশ্লিষ্ট মহল। অপরাধীদের শনাক্ত করতে গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। নির্দেশনা ছিল স্পষ্ট—মাত্র তিন কর্মদিবসের মধ্যে জমা দিতে হবে তদন্ত প্রতিবেদন। কিন্তু ৩৩ দিন পার হয়ে গেলেও দেয়া হয়নি তদন্ত প্রতিবেদন। তবে কি অপরাধী কাউকে বাঁচাতে কিংবা থলের বিড়াল বেরিয়ে আসার ভয়েই অন্ধকারে রাখা হচ্ছে সেই প্রতিবেদন, এমনটাই আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

পদ্মা অয়েলের তথ্যমতে, গত ১৮ মে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ডিপো থেকে বিমানের ৯ হাজার লিটার জেট ফুয়েল এবং ৫ হাজার লিটার ডিজেল চুরির ঘটনা ঘটে। এ সময় তেলভর্তি একটি ট্যাংক লরীসহ ২ জনকে আটক করা হয়। এ ঘটনায় পতেঙ্গা থানায় মামলাও করা হয়।

পদ্মার তথ্যমতে, চুরির সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়ে লরি চালক মো. জসিম উদ্দিন ও প্রধান স্থাপনার শ্রমিক মো. ইদ্রিস ভুট্টোকে আটক করে সাময়িক বরখাস্ত করে কর্তৃপক্ষ। একইসঙ্গে চট্টগ্রামের পদ্মার গুপ্তখালের ডিপো ইনচার্জ সোহেল ইদ্রিস ও শিফট ইনচার্জ মিলটন রায় কেও সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। উল্লেখ্য, চালক জসিম উদ্দিন গত বছর পবিত্র হজ্ব পালন করে এসেছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই আটকের ঘটনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থা। এ অভিযান পরিচালনা করে কোস্টগার্ড ও পুলিশ। বছরের পর বছর এমন কাজ চললেও এভাবে তেল চুরির আটকের ঘটনার কোন কিছুই মনে করতে পারছে না পদ্মার কর্মকর্তারা। মধ্যপ্রাচ্যে তেল সংকটের কারণে সরকার গোয়েন্দা সংস্থাকে কাজে লাগিয়েছে বলেই এই আটকের ঘটনা ঘটেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা সবসময় সন্দেহ তৈরি করে। কারণ, সময় যত বাড়ে প্রমাণ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও তত বাড়ে। একইসঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়ে জবাবদিহির কাঠামোও।

বিপিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গোপন সমঝোতায় এমন কাজ হয় বলে কখনো ধরা পড়ে না। তবে অনেকটা লোক দেখানো আটকের ঘটনা ঘটায় স্ব-ইচ্ছায় কিংবা দ্বৈবচক্রে, যার পরিমাণ মাত্র ৩-৪ শতাংশ।

তথ্য সূত্র বলছে, প্রতি বছর দেশে নানা কারসাজি করে তেলের ডিপো থেকে চুরি হয় প্রায় ৩০ কোটি টাকার তেল। এ ছাড়াও পাইপ লাইন থেকে আনুমানিক ৫০ কোটি, নদী পথে ১৫০ কোটি এবং কালোবাজারি করে চুরি করা হয় ৫০ কোটি টাকার তেল। এভাবে চুরি তেলের বছরে দাঁড়ায় ২৮০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা। এ ছাড়াও কখনো বড় সিন্ডিকেট সুযোগ পেলে চুরির অংক বেড়ে দাঁড়ায় ৫০০ কোটি টাকার অধিক।

এমন চুরিকাণ্ডের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে তেল কোম্পানিগুলোর রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে উঠা শ্রমিক সংগঠন তথা সিবিএ নেতারা। তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন অফিসের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

পদ্মার সাপ্লাই চেইনে কোনো অসংগতি ছিল কি না, এতে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত ছিল কি না জানতে চাইলে মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) মুহাম্মদ রোমান চৌধুরী কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি।

একইভাবে উপ মহাব্যবস্থাপক (মানব সম্পদ ও প্রশাসন) মীর মো. ফকরউদ্দিন জানান, শিঘ্রই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট দেয়া হবে।

এ বিষয়ে পদ্মা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অধিকতর তদন্তের জন্যই সময় বাড়ানো হয়েছে, যাতে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা যায়। আশাকরি কয়েকদিনের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদনটি হাতে পাব। এর উপর ভিত্তি করেই তাদের (অভিযুক্তদের) আগামী কর্ম জীবন নিভর করবে। এতে কোনো গোপন সমঝোতায় যাবে না কর্তৃপক্ষ।