কফিনবন্দি নিথর দেহটি যখন গ্রামে পৌঁছাল, কান্নার শব্দে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। এক মাস আগে মালয়েশিয়ায় নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যাওয়া আব্দুল্লাহ কাজল (২৩) অবশেষে ফিরলেন নিজের বাড়ি, রামু উপজেলার পেঁচার দ্বীপে। তবে জীবিত নয়—লাশ হয়ে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, জীবিকার আশায় দুই মাস আগে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান কাজল। তার সঙ্গে একই এলাকার আরও দুই তরুণ ফারুক ও জাহাঙ্গীর বিদেশে যান। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় এক দালাল শফির প্রলোভনে দ্রুত কাজ ও ভালো আয়ের আশ্বাসে তারা দেশ ছেড়েছিলেন।
মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পরই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। কাজলের পরিবারের দাবি, সেখানে একটি চক্র তাদের আটক করে এবং প্রত্যেকের পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করে। ফোনে নির্যাতনের বর্ণনা শুনে ভেঙে পড়েন স্বজনেরা।
কাজলের বড় ভাই বলেন, ‘ও ফোনে কাঁদত। বলত, টাকা না দিলে মারধর করছে। আমরা যা পারছি করেছি।’ তিনি জানান, পরিবার ও এলাকাবাসী চাঁদা তুলে, গবাদিপশু বিক্রি করে এবং জমি বন্ধক রেখে চার লাখ ২০ হাজার টাকা জোগাড় করেন।
অভিযোগ উঠেছে, সেই টাকা দালাল শফির হাতে তুলে দেওয়া হলেও তিনি তা নির্যাতনকারীদের কাছে পাঠাননি; বরং আত্মসাৎ করেন। টাকা না পৌঁছানোয় নির্যাতনের মাত্রা বাড়ে এবং একপর্যায়ে মারধরের আঘাতে মারা যান আব্দুল্লাহ কাজল।
প্রায় এক মাস আগে মৃত্যুসংবাদ পৌঁছায় গ্রামে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত বৃহস্পতিবার রাতে মরদেহ পৌঁছায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে শুক্রবার ভোরে লাশ নেওয়া হয় কক্সবাজারে। দুপুরের পর পেঁচার দ্বীপে পৌঁছালে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়।
কাজলের মা বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছিলেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে এখন নিঃস্ব পরিবারটি। ঘরের এক কোণে পড়ে আছে তার ব্যবহৃত জামা ও পুরোনো একটি মোবাইল ফোন—যেখান থেকে শেষবার শোনা গিয়েছিল সাহায্যের আকুতি।
ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। কক্সবাজার জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, মানবপাচার ও মৃত্যুর অভিযোগ গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।
এদিকে কাজলের দুই সহযাত্রীর একজন এখনো মালয়েশিয়ার কারাগারে রয়েছেন বলে জানা গেছে। অপরজন বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে দেশে ফেরার প্রক্রিয়ায় আছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপকূলীয় এলাকায় সক্রিয় মানবপাচার চক্র দীর্ঘদিন ধরে বেকার তরুণদের টার্গেট করছে। স্বল্প সময়ে বিদেশ পাঠানোর প্রলোভনে অনেকেই পড়ছেন জিম্মি ও নির্যাতনের ফাঁদে।
পেঁচার দ্বীপের এক বাসিন্দা বলেন, কাজলের মতো আর কোনো মা যেন সন্তান না হারায়। দালালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, শুধু দালাল গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; আন্তর্জাতিক রুটে সক্রিয় পাচার চক্র ভেঙে দিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়ায় কঠোর নজরদারি না বাড়ালে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু থামানো কঠিন হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন