রশিদা বেগম (৬০)। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার ৭নং শিবনগর ইউনিয়নের ফকিরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। দুই ছেলে ও এক মেয়েকে রেখে প্রায় ১৯ বছর আগে স্বামী আবেদ আলী মারা গেছেন। তখন থেকে কারো কাছে হাত পাতেননি, ভিক্ষার পেশাকেও গ্রহণ করেননি এই নারী। আত্মমর্যাদা আর নিজের শ্রমকে পুঁজি করে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন রশিদা বেগম। নিজের শ্রমের উপার্জনকে সবচেয়ে সম্মান হিসেবে গ্রহণ করে ফুলবাড়ী পৌর বাজারে শাক-সবজি আর ডিম বিক্রির ব্যবসা নিয়েই জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন।
জানা যায়, প্রায় ১৯ আগে স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরেন রশিদা বেগম। অনেক কষ্ট করে তিন ছেলেমেয়েকে বড় করেছেন। তাদের বিয়ে দিয়েছেন। সন্তানরা নিজ নিজ সংসার নিয়ে আছে। তবে রশিদা বেগম সন্তানদের বোঝা হয়ে থাকতে চান না বলে সবজি ব্যবসা করে নিজের উপার্জনে নিজের জীবনযাপন করে চলেছেন।
রশিদা বেগম প্রতিদিন ভোরে কোনো যানবাহন ছাড়াই হেঁটে প্রায় তিন কিলোমিটর পথ পারি দিয়ে ফুলবাড়ী পৌরশহরের সবজি বাজারে বসেন। তার কাঁধে থাকে বিকেলে সংগ্রহ করা টাটকা শাক-সবজির পুঁটলা। বাজারে সবজির দোকান ও ডিম হাটের মাঝামাঝি লক্ষ্মী জুয়েলার্সের দেয়াল ঘেঁষে বসে বেচেন কচুশাক, ঢেকুয়া শাক, কলা গাছের থোড়, কলার মোকচা, বতুয়া শাক, ডিম ইত্যাদি। দুপুর পর্যন্ত ব্যবসা শেষে যা আয় হয়, তা দিয়েই সংসারের খরচ চালান। বাড়ি ফিরে নিজেই রান্না করে খাবার প্রস্তুত করেন।
পাশের সবজি বিক্রেতা শাহজামাল হোসেন, মো. রাজু ও হারুনুর রশিদ বলেন, রশিদা আপার অবস্থা বিবেচনায় তিনি চাইলে ভিক্ষা করে চলতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা পছন্দ করেন না। তিনি মনে করেন ভিক্ষার মধ্যে কোনো সম্মান নেই। আমরা ব্যবসার কাজে তাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করি।
সামনে বসে ডিম ব্যবসায়ী তোবারক হোসেন বলেন, আমার ব্যবসার কিছু ডিমও রশিদা আপা বিক্রি করেন। এতে তার কিছু লাভ হয়।
ফল বিক্রেতা স্বপন দত্ত বলেন, একজন বয়স্ক বিধবা নারী হয়েও যে আত্মসম্মান নিয়ে ব্যবসা করছেন, এজন্য আমরা তাকে শ্রদ্ধা করি।
লক্ষ্মী জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী অজিত স্বর্ণকার বলেন, রশিদা বেগম অনেক ভালো মানুষ। তিনি ভিক্ষা না করে ব্যবসা করে জীবন চালাচ্ছেন। এটি সমাজের জন্য অনুকরণীয়। অনেকেই সামান্য অজুহাতে ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নেয়, কিন্তু তিনি সম্মান নিয়ে বাঁচতে চান।
রশিদা বেগম বলেন, স্বামী আবেদ আলী মারা গেছেন প্রায় ১৯ বছর আগে। ছেলে-মেয়েদের বড় করেছি, বিয়ে দিয়েছি। এখন চাইলে মানুষের কাছে হাত পেতে চলতে পারতাম। এলাকায় ভিক্ষা করলে অন্যদের মতো দিনে ৪০০-৫০০ টাকা আসত। কিন্তু অন্যের করুণা নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই না। ভিক্ষা করা অসম্মানের। যতদিন শরীরে শক্তি আছে, ততদিন কাজ করেই চলতে চাই।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ হাছান বলেন, রশিদা বেগম ভিক্ষা না করে আত্মমর্যাদা নিয়ে শাক-সবজির ব্যবসা করে জীবন চালাচ্ছেন এমন নারীর জন্য কিছু করা দরকার। তদন্তসাপেক্ষে রশিদা বেগমের জন্য যা করা যায় সেটি করার জন্য উদ্যোগে নেওয়া হবে।

