ঢাকা বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬

বিদ্যালয়ে ঘণ্টা বাজলেও দেখা মিলে না শিক্ষকদের

জহিরুল ইসলাম, গাজীপুর
প্রকাশিত: জুন ১০, ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলায় ১২৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে প্রায় পঞ্চাশটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য স্কুলে কর্মরত শতাধিক সহকারি শিক্ষকের বিরুদ্ধে সময় মত প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত না থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসকল শিক্ষদের কেউ গাজীপুর শহরের জয়দেবপুর, কেউ টঙ্গি, আবার অনেকেই রাজধানীর উত্তরাসহ ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় পরিবার নিয়ে  বসবাস করেন।

উপজেলা শিক্ষা অফিসে দাপ্তরিক কাজের অজুহাতে শহরে বসবাসকারি প্রধান শিক্ষকসহ সহকারি শিক্ষকরা দুপুরের আগেই বিদ্যালয় ত্যাগ করেন। তারা বিদ্যালয়ে আসেন এগারোটা-বারোটায় আবার নানা অজুহাতে চলে যান দুপুরের আগেই।

এ সমস্ত অনিয়ম তদারকি করার দায়িত্বে আছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জেসমিন আক্তার। খোদ তার বিরুদ্ধেই রয়েছে যথাসময়ে অফিসে না আসা ও দুপুরের আগে অফিস ত্যাগের গুরুতর অভিযোগ। তবে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেন।

এ সকল শিক্ষকরা বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী-এমপিসহ স্থানীয় সাবেক সাংসদ মেহের আফরোজ চুমকির ডিও লেটার বা আধা সরকারি পত্রের মাধ্যমে কালীগঞ্জের বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে আসেন। তারা সরাসরি মন্ত্রণালয় বা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে বদলি বা পেষণ আদেশ নিয়ে স্কুল গুলোতে পদায়িত হওয়ার কারণে তাদের অন্যত্র বদলি বা পেষণে সংযুক্ত করতে পারছেন না অধঃস্তন জেলা বা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস।

ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বিগত দিনে তারা বিদ্যালয়ে যথাসময়ে উপস্থিত না হয়ে নামমাত্র দায়িত্ব পালন করে বছরের পর বছর বেতন-ভাতাসহ সরকারি সকল সুবিধা ভোগ করছেন। ফলে বিদ্যালয়গুলোর সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়ার পাশাপাশি পাঠদান কার্যক্রমসহ শিক্ষার পরিবেশ চরমভাবে ব্যহত হয়েছে যা বর্তমানেও অব্যহত আছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের আমলেও পূর্বের এ ধারা অব্যাহত দেখে অভিভাবকরা এখন উদ্বিগ্ন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, অধিকাংশ স্কুলে অভিভাবকদের বসার জন্য কোন ছাউনি নেই। বেশীর ভাগ স্কুলে ওয়াশ ব্লক না থাকায় শিক্ষার্থীদের স্যানিটেশন বা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব হচ্ছে না। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের রিডিং পড়া বা সাবলিল পাঠক তৈরি করার কথা থাকলেও গণিতের যোগ, বিয়োগ, পূরণ, ভাগ করতে শিক্ষার্থীরা পারদর্শী কি না সেই বিষয়েও নেই কোন তদারকি। উপজেলায় প্রায় আটশত শিক্ষক কর্মরত থাকলেও অতিসম্প্রতি বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক বাছাইয়ে মাত্র ১২জন শিক্ষক অংশ নেন।

এ নিয়েও শিক্ষকদের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে- এ প্রতিযোগিতায় প্রস্তুতির জন্য শিক্ষকদের নির্ধারিত সময়ে অবহিত করা হয়নি। শিক্ষক পদায়নে কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। এতে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহল।

উপজেলার ১২৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার স্বার্বিক অবস্থা এখন হযবরল। বেশ কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদায়নে অনিয়ম রয়েছে। কোন কোন বিদ্যালয়ে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম। ব্রাহ্মণগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দশজন শিক্ষকের স্থলে পাঁচজন শিক্ষক বর্তমানে কর্মরত। এরকম শিক্ষক সংকটে থাকা বিদ্যালয় গুলো দুর্গম এলাকায়।

অপরদিকে গাজীপুর বা ঢাকায় যাতায়াতে সুবিধাজনক বিদ্যালয় গুলোতে আবার প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিক্ষক কর্মরত আছেন। যারা আওয়ামী লীগ সরকার আমলে বদলি বা পেষণাদেশে বদলি হয়েছেন সেসব শিক্ষকরাই এ সুবিধা ভোগ করছেন। ছাত্র-ছাত্রী উপস্থিতির সংখ্যা তুলনামূলক কম, কর্তৃপক্ষের তদারকির ঘাটতি, অনেক বিদ্যালয়ে ছাত্র অনুপাতে শিক্ষক বেশী। কোন কোন স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতি ২০/৩০ জনের চেয়েও কম লক্ষ্য করা গেছে।

এসব অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জেসমিন আক্তার বলেন, ‘কিছু শিক্ষক মাঝে মাঝে স্কুলে দেরিতে পৌঁছে। আমি যোগদানের পর হতে নিয়মিত স্কুল পরিদর্শন করে আসছি। যে সকল শিক্ষক বিদ্যালয়ে দেরিতে পৌঁছবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. মাসুদ ভুঁইয়া জানান, শিক্ষায় অব্যবস্থাপনা ও কিছু প্রধান শিক্ষক ও সহকারি শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়টি অবগত হয়েছি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হবে।

প্রাথমিক শিক্ষায় চরম অব্যবস্থাপনার ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ.টি.এম কামরুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে ও অনিয়ম ঠেকাতে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে খুব শিঘ্রই সভা আহ্বান করা হবে।’

এতো সব অনিয়মের বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য এ.কে.এম ফজলুল হক মিলনের হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করলে তিনি রিসিভ করেননি। ক্ষুধে বার্তা পাঠিয়েও তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।